২১ জুন ২০২২
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ছাতক-দোয়ারায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষের আর্তনাদ থামছেনা। বন্যায় তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। গত রোববার থেকে ধীরগতিতে বাসা-বাড়ি থেকে পানি নামতে শুরু হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও খাবার পানির তিব্র সঙ্কট। বন্যায় ভেসে গেছে অনেকের ঘর-বাড়ি, আসবাবপত্রসহ ধান-চাল ও গবাদিপশুর খাবার। পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে খামারের মাছ ও গবাদিপশু। এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি ও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এখানের মানুষ। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে বন্যা আর মানুষের কান্না একাকার হয়েছিল। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে এক পুলিশ সদস্য ও নৌকা ডুবে শিশুসহ দুই উপজেলায় ১৬জন লোক মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত ১৫ জুন থেকে ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ছাতক-সিলেট, ছাতক-দোয়ারা, দোয়ারায় ভায়া সুনামগঞ্জ, জালালপুর-লামা রসুলগঞ্জ, কৈতক-ভাতগাঁও, ছাতক-আন্ধারীগাঁও-জাউয়াবাজার, গোবিন্দগঞ্জ-বসন্তপুরসহ সবকটি সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এ কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
প্রাণ বাঁচাতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে নিতে ছুটাছুটি করতে থাকে স্বজনরা। নৌকায়, সাঁতার কেটে, আবার কেউ কেউ ভেলায় ছড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করে। এসময় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নৌকাই ছিল মানুষের যাতায়াতের এক মাত্র ভরসা। ব্যবধান ছিল ২০ টাকা গাড়ি ভাড়ার পরিবর্তে নৌকা ভাড়া ৫শ’ থেকে ১হাজার টাকা। এ সুযোগে নৌকার মালিক-শ্রমিকরা ফুঁলে গেছে। ফুঁলে গেছে অসাধু কিছু মুদি দোকানিরাও। তারা ৫ টাকার মোমবাতি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের কাছে বিক্রি করেছে ২০টাকায়। শুকনো খাবারের মূল্য নিয়েছে দ্বিগুণ।
এদিকে, ছাতক-থেকে গোবিন্দগঞ্জে যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে খালেদ আহমদ (৩০) নামের এক যুবক নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ৩দিন পর খারগাঁও মাধবপুর এলাকায় ভাসমান অবস্থায় তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের পর দাফন করা হয়। সে উপজেলার ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের আহমদ আলীর পুত্র।
বন্যায় কালারুকা ইউনিয়নের মুক্তিরগাঁও গ্রামের নিজ বাড়ি এলাকায় পানিতে ডুবে তমাল আহমদ (২০) নামের এক প্রতিবন্ধি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সে ওই গ্রামের ব্যবসায়ী শরিফ হোসেন সূরুজ আলীর পুত্র। বাড়ি থেকে পরিবারের সাথে জাউয়াবাজার ডিগ্রি কলেজে আশ্রয় কেন্দ্রে আসার পথে নৌকা ডুবে ৬ বছরের এক কন্যা শিশু নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ২দিন পর শিশুর লাশ হাওরে ভেসে উঠে।
এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলায় গত ১৪ জুন থেকে ২১জুন পর্যন্ত নৌকাডুবিসহ বিভিন্ন দূর্ঘটনায় অন্তত ১৩জন লোক মারা গেছে। এদের মধ্যে স্কুল পড়ুয়া দুই ভাই-বোনসহ এসএমপির পুলিশ কনস্টেবলও একজন রয়েছেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার ইমাম উদ্দিন (৬৫) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এখানের বাতাসের সাথে চারদিকে লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। নিখোঁজ আছেন কতজন তার কোন হিসেব মিলছেনা। ১৬ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন কাটিয়েছিলেন ছাতক-দোয়ারার মানুষ। ছিলনা মোবাইল নেটওয়ার্ক। পানি কমতে শুরু হওয়ায় রোববার রাত থেকে কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে।মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধাও পেয়েছে ওইসব এলাকার মানুষ।
অপরদিকে, দুই উপজেলার লাখ লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। বিভিন্ন দ্বিতল ভবনে ছাদে ছামিয়ানা টানিয়ে বসবাস করছেন মানুষ। হাট-বাজারের কোন দ্বিতল ভবন খালী নেই। সব ভবনেই মানুষ। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মূল্যে খাদ্যসহ মালামাল বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার থেকে ছাতকে ও সোমবার থেকে দোয়ারায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহলে নিয়োজিত আছে। মানুষকে উদ্ধার করে স্পিডবোর্ড যোগে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়াসহ সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে তাদের গাড়ি দিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে দেখা গেছে। কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতাল, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা সদর হাসপাতালে এখনও রয়েছে পানি।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি দেবদুলাল ধর বলেন, বন্যায় দোয়ারা উপজেলায় ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে পানি ছিল। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটাছুটি করেন। একদম অসহায় হয়ে পড়েছিলেন মানুষ।
তিনি বলেন, এ বন্যায় দোয়ারাবাজার উপজেলায় নৌকাডুবিসহ ১৩জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১১জনের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
ছাতক থানার ওসি মাহবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাইমিনিস্টারের সাথে কনফারেন্সে আছেন বলে তার ফোন রিসিভ করে জানানো হয়।
তবে থানার এসআই মহিন উদ্দিন বলেন, বন্যায় নৌকাডুবে এখানে কতজন লোক মারা গেছে এ বিষয়ে থানায় কোন লিখিত তথ্য নেই। স্বজনরাও লাশ উদ্ধারের তথ্য পুলিশকে দেয় নাই।
গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ সাধারণ সম্পাদক রইছ আলী জানান, সোমবার দুপুরে সরকারের পক্ষ থেকে গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়নে ২শ’জনকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণকৃত প্রতিটি প্যাকেটে চিড়া, মুড়ি, গুড়, মোমবাতি, ম্যাচ ও এক প্যাকেট বিস্কুট ছিল।
ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানান, আমরা এখনো পানির উপর ভাসছি। পানি আগে কমতে হবে, সড়ক পথে গাড়ি চলতে হবে। পানি না কমলে, গাড়ি না চললে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ পৌঁছাতে সমস্যা হবে। তিনি বলেন, সোমবার উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।