২৩ জানুয়ারি ২০২২
ইউনুছ চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেটে করোনা সংক্রমণের হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত ১০ দিনে সংক্রমণের হার বেড়েছে ১৮ শতাংশের উপরে। গত ১২ জানুয়ারি সংক্রমণের হার ছিল ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। ১০ দিনের ব্যবধানে গতকাল ২২ জানুয়ারি সংক্রমণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে গত ১৫ জানুয়ারি করোনা আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, নতুন করে সংক্রমণে শিশুদের আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সর্দি-জ্বরের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের টেস্ট করে করোনা সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের অতিরিক্ত সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত। সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত আছে জানিয়ে জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ( শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ৩২৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ১৩৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে এই ৩২৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্ত ৩২৮ জনের মধ্যে সিলেট জেলার ২১৬ জন, ওসমানী হাসপাতালের ৩১ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ১ জন, হবিগঞ্জ জেলার ২৮ জন ও মৌলভীবাজার জেলার ৫২ জন। যদিও, গত ১২ জানুয়ারি শনাক্তের হার ছিলো ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুসারে, ১২ জানুয়ারি ৯৮৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৫১ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। এরপর থেকে ক্রমাগত সংক্রমণের হার বাড়তে থাকে। ১৩ জানুয়ারি সংক্রমণের হার হয় ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, ১৪ জানুয়ারি ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, ১৫ জানুয়ারি ১০দশমিক ৭২ শতাংশ, ১৬ জানুয়ারি ১৩ দশমিক ৮১ শতাংশ, ১৭ জানুয়ারি ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ১৮ জানুয়ারি ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ১৯ জানুয়ারি ২৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, ২০ জানুয়ারি ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, ২১ জানুয়ারি ২৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং শনিবার সংক্রণের হার দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এদিকে, সিলেটসহ সারাদেশে সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় সরকার দেশের সব স্কুল, কলেজ ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধসহ ১১টি নির্দেশনা জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একশ’ জনের বেশি মানুষের সমাবেশ করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে যারা যোগ দেবেন, তাদের অবশ্যই টিকা সনদ অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে করা পিসিআরে কোভিড টেস্টের রিপোর্ট দেখাতে হবে। সরকারি, বেসরকারি অফিস এবং শিল্প কারখানায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিকা সনদ নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বাজার, শপিং মল, মসজিদ, বাস স্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেল স্টেশনসহ সাধারণ লোকসমাগমের স্থানে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার এবং যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
সিলেটের অতিরিক্ত সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত জানান, সিলেটে সংক্রমণ বাড়লেও এখনো পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অনেকে আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো অবস্থা হচ্ছে না। তাই, পরিস্থিতি যাতে কঠিন না হয়ে পড়ে; সেজন্য আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে।
তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও সিলেটে নতুন করে বাড়তে থাকা সংক্রমণে শিশুদের আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সর্দি-জ্বরের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের নিকট আসা ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের টেস্ট করে করোনা সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে সিভিল সার্জন অফিস সার্বক্ষণিক প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছে। সকলকে সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
সিলেটের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. আখলাক আহমদ বলেন, গত এক সপ্তাহ থেকে করোনার উপসর্গ যেমন সর্দি, কাশি নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে বেশি আসছে। তবে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন না। অভিভাবকরা না চাওয়ায় তাদের টেস্ট করা যাচ্ছে না। তবে যারা ভর্তি হচ্ছেন; তাদের টেস্ট দেওয়া শুরু হয়েছে।
তিনি শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, কারো মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে থাকা এবং মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। তবে, বর্তমানে মাস্ক ব্যবহারে অনেকের মধ্যে অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে জানান এ চিকিৎসক।
শহীদ ডা: শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা: হোসেন আহমদ রুবেল জানান, শনিবার পর্যন্ত এ হাসপাতালের আইসিইউতে ৬ জন করোনা রোগী ভর্তি ছিলেন। আর সাধারণ ওয়ার্ডে ৩০ জন রোগী ভর্তি আছেন। করোনায় শিশুরা আক্রান্ত হবার খবর পাচ্ছেন বলেও জানান এ চিকিৎসক।
এদিকে, সংক্রমণ প্রতিরোধে এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শনিবার সিলেটের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্টের ১০টি দল অভিযান চালায়। অভিযানে সরকারি নির্দেশনা না মানায় ৪৬ জনকে ৪৫টি মামলায় ২৪ হাজার ২শ’ টাকা জরিমানা করা হয়।
করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসন কাজ করছে জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে মোবাইল কোর্টের অভিযান চলছে এবং একই সাথে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সিলেটের বিভিন্ন অংশে ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪৬৯ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ৬১৬ জন, ওসমানী হাসপাতালে ৫ হাজার ৮৮ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৬ হাজার ৩৩৯ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ৬ হাজার ৮৭৫ জন ও মৌলভীবাজার জেলায় ৮ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, সিলেট বিভাগে করোনামুক্ত হয়েছেন ৫০ হাজার ৪০৯ জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সিলেট জেলায় ৩১ হাজার ১৯ জন, ওসমানী হাসপাতালে ৮৫৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৬ হাজার ১৫৩ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ৪ হাজার ৮৮৬ জন ও মৌলভীবাজার জেলায় ৭ হাজার ৪৯৬ জন। সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন মোট ১ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ৮৭৩ জন মারা গেছেন, ওসমানী হাসপাতালে ১১৮ জন, সুনামগঞ্জে ৭৫ জন, হবিগঞ্জের ৪৮ জন ও মৌলভীবাজারের ৭২ জন।