২৮ ডিসেম্বর ২০২০
ডেস্ক রিপোর্ট : কারো কাছে তিনি রাজপুত্তুর। কারো কাছে অঘোষিত সম্রাট। অবশ্য কেউ মানুক আর না মানুক-লোকটির নামের শেষে যুক্ত রয়েছে তাজ। তিনি তারেক উদ্দিন তাজ। ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। মামা এক সময়ের সিলেটের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ফলে মামার ভাগিনা তাজ প্রথমবারের মতো অংশ নিলেন সিসিকের কাউন্সিলর নির্বাচনে। প্রথম নির্বাচনেই বাজিমাত !
ওই ওয়ার্ডে এমনকি তারেকের সেন্টারে দলীয় মেয়র প্রার্থী প্রয়াত সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন কামরান পরাজিত হলেও তাজের মাথায় মুকুট আসে বিজয়ের। তারপর থেকেই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তিনি। কাউন্সিলর পরবর্তী ঝুলিতে অর্জণ না থাকলেও অপকর্মের অভিযোগ জমা হয়েছে দীর্ঘ। অবশ্য, তিনি অভিযোগের তোরাই কেয়ার করেন।
নির্বাচনে বিজয়ের স্বাদ পেয়ে পুরোই পাল্টে যান তারেক উদ্দিন তাজ। এলাকাবাসীর সাথে নির্বাচনকালীণ সদ্ভাব থাকলেও এখন তিনি কথা বলেন, না চেনার স্বরে। প্রতিবেশি শামীমের কথায় জানা গেল এমন তথ্য।
তিনি বলেন, ‘তারেক উদ্দিন তাজের সাথে কথা বলতে গেলে মনে হবে যেনো তিনি কোনো কাউন্সিলর নয়, এদেশের কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার’।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়, রয়েছে লাঠিয়াল বাহিনী পরিচালনার অভিযোগও। এই বাহিনীর মাধ্যমে চলে জুয়া বাণিজ্যসহ অপরাধমূলক নানা কার্যক্রম। রয়েছে সরকারি ভূমি দখলের অভিযোগও। চলতি বছরের ১১ মার্চ এমন অভিযোগ তোলে তাজের অপকর্মের ফিরিস্থি তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষে ব্যবসায়ী মঈন উদ্দিন অভিযোগ করেন, ‘কাউন্সিলর তারেক উদ্দিন তাজ ও তার ভাই ইফতে কামরুল হাসান তায়েফ সরকারি ভূমি থেকে অবৈধভাবে মাটি বিক্রি করছেন এবং এলাকায় ও মদ-জুয়া ব্যবসায় আশ্রয় দিচ্ছেন।’
গত ১১ ডিসেম্বর সিলেটের জৈন্তাপুরের একটি রেস্টুরেন্টে পাখির মাংস দিয়ে ভূরিভোজ করেও বিতর্কে জড়ান তিনিসহ সিসিকের আরও ৪ কাউন্সিলর। ভূরিভোজের সেই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তারেক উদ্দিন তাজ একজন হামলাকারী-এমন অভিযোগও নতুন নয়। ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে দলীয় সমাবেশে এসে হামলার শিকার হন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ছাত্রলীগের একটি অংশ তার ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায়ও দায়েরকৃত মামলার আসামি ছিলেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি তারেক উদ্দিন তাজ।
সর্বশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন আইনজীবী তালিকাভুক্তির জন্য বার কাউন্সিলের লিখিত পরীক্ষা চলাকালে রাজধানী ঢাকায় তাণ্ডব চালিয়ে। গেল শনিবার অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় ঢাকার একটি পরীক্ষা হলে অরাজকতার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কাউন্সিলর তারেক উদ্দিন তাজকে। শনিবার হাঙ্গামার পরই ঘটনাস্থল থেকে তাজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষায় অরাজকতাসহ কেন্দ্রে ভাংচুর করে সরকারি কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করাসহ বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগে মোট ৩টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নিউমার্কেট থানা। তিনটি মামলার একটিতে তারেক উদ্দিন তাজ প্রধান আসামি। আর শিগগির তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এসব মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রভাব খাটানোর অভিযোগের শেষ নেই। কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব পেলেও প্রভাব খাটিয়ে কোনরকম নিয়োগপ্রক্রিয়া ছাড়াই এ পদটি স্থায়ী করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তা এবং সরকারীদলের একজন ব্যক্তি হয়ে তার এমন কাজ নিয়ে দেখা দিয়েছে কঠোর সমালোচনা। তার এমন কাজ ‘সরকারকেই বিতর্কিত করছে’ বলে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তারেক উদ্দিন তাজ একজন সরকারীদলের মানুষ। উনার উচিত সরকারের সকল ভালো কাজে সহায়তা করা। কিন্তু উনি যে কাজটি করেছেন সেটি সরকারকে বিতর্কিত করলেন।
উনি সিসিকের কাউন্সিলর এবং সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিডিয়া, প্রশাসন ও জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আছেন এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য কি জানতে চাইলে ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোন ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নিক সেটি আমি বলছি না। সেটা তারা তাদের করনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।
এদিকে, তারেকের ব্যাপারে তেমন কোন কথাই বলতে চান না সিলেট ইন্টারন্যাশলান ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। কেবল তাই না, এক সপ্তাহ আগে তাজ ঢাকায় গ্রেপ্তার হলেও এ ব্যাপারে এখনো কিছুই জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক নিযুক্ত সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট সদস্য প্রফেসর আক্তারুল ইসলাম বলেন, আমি বিষয়টি এই প্রথম শুনলাম। আমি মূলত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে তাদের কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য নিযুক্ত সিন্ডিকেট সদস্য। এখন এটার মূল কাজ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের। যদি উনি বিনা নোটিশে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে রেজিস্ট্রার উপাচার্যকে জানাবেন। উপাচার্য সিদ্ধান্ত নিবেন। প্রয়োজন হলে সিন্ডিকেট সদস্যদের জানাবেন। তাছাড়া যদি উনি কোন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে থাকেন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি করা যেতে পারে। তারা তদন্ত করবেন। এভাবে অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু আমি যেহেতু বিষয়টি এই প্রথম অবগত হলাম সুতরাং আমি খুব বেশি কিছু বলতে পারছি না। আপনি বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারাই ভালো বলতে পারবেন। আর আমিও খোঁজ নিচ্ছি।
আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন ভোগছেন সিদ্ধান্তহীনতায়। কেউ নিজ থেকে কোন দায় নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না। একজন চাপিয়ে দিচ্ছেন আরেকজনের উপর।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি ভাবছে জানতে চাইলে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আধ্যাপক ড. শহীদ উল্লাহ তালুকদার বলেন, আপনার এতো ইন্টারেস্ট কেন বিষয়টা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কি করছে বা করবে সেটা গণমাধ্যমকে জানানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। তাছাড়া যেহেতু এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একাই সব না। ট্রাস্টি বোর্ড আছে, সিন্ডিকেট সদস্য আছেন, সুতরাং তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারটা দেখতে হবে। তারা কি ভাবেন সেটাই আসল।
তারেক উদ্দিন তাজের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিতর্কিত বিষয় নিয়ে তিনি বলেন- আমি খুব বেশিদিন হয়নি এখানে এসেছি। আপনি কোন তথ্য জানার থাকলে রেজিস্ট্রারের সাথে কথা বলবেন। তাছাড়া তারেক উদ্দিন তাজ যদি কোথাও গ্রেপ্তার হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রার আমাকে জানাবেন, আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। তাই আপনি রেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগ করেন।
সবশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কথামত সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার নসরত আফজা চৌধুরী বলেন, আপনারা যেরকম জানেন আমরাও এইরকমই জেনেছি উনি কোথায় আছেন। উনার পরিবারের সাথে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। এক সপ্তাহ থেকে উনি অনুপস্থিত তাহলে অফিসিয়ালি কি কোন কিছু জানার চেষ্টা করেছিলেন; প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো জানি। তাহলে আর অফিসিয়ালি জেনে কি করব।’
অভিযোগ আছে উনার দায়িত্বে থাকা পদের ক্ষেত্রে উনি প্রভাব খাটিয়েই আছেন; এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি ঠিক বলতে পারব না। যারা আপনাকে কথাটি বলেছে তারাই ভালো বলতে পারবে। কততম সিন্ডিকেট মিটিং এর সুপারিশ-ক্রমে উনার নিয়োগ স্থায়ী হয়েছিলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আমি ঠিক বলতে পারছি না। এ ব্যাপারে পরে কথা হবে; বলে ফোন রেখে দেন।