৬ জুন ২০১৮
আব্দুস সালাম, সুনামগঞ্জ থেকে : হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় পাউবো’ কর্তৃক হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুনীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা হাওরের অথৈই জলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন হাওরপাড়ের সাধারণ কৃষকসহ বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে হাওররক্ষায় সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান সত্যিই প্রসংশার দাবি রাখে না। তবে সরকারি আর্থিক বরাদ্দ বেশি হওয়ায় অনেক প্রকল্পেই সংগতিহীন উপ-বরাদ্দ দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকার হাওরের ফসলরক্ষার জন্য ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন শাল্লা উপজেলায়। উপজেলায় এডিপি ও কাবিটা স্কীমে মোট ১৮০টি প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দকৃত সমূহ অর্থের যথার্থ প্রয়োগ হয়নি এ উপজেলায়। অসংগতিপূর্ণ বরাদ্দের কারণে সরকারি অর্থ লোপাটে মরিয়া হয়ে উঠতে দেখা গেছে পিয়ন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী, কিছু অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গসহ একটি সিন্ডিকেট চক্র।
পিআইসি পেতে ডাক বাংলায় শত শত মানুষের ভিড় লেগেই থাকতো। ডাক বাংলার কেয়ারটেকার আঃ সালামের দোকানে চলতো কপি খাওয়ার ধূম। কার থেকে কে কতো টাকা বেশি দিয়ে পিআইসি নিতে পারে এমন প্রতিযোগিতাও পরিলক্ষিত হয়। ওয়ার্ক অর্ডার পেতে প্রতিটি পিআইসির কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ২হাজার টাকা। তারপর প্রতিটি বিল উত্তোলনে দিতে হয়েছে লাখ টাকা। লুটপাটের ধান্দায় কোন বাঁধই নীতিমালা অনুযায়ী কাজ হয়নি। উপজেলা বাঁধ মনিটরিং কমিটির বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগ। তারাও প্রতিটি পিআইসির নিকট থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া বাবদ এনেছেন ২হাজার টাকা। এব্যাপারে ওই কমিটির হেমন্ত কুমার সরকারের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এখন তৃতীয় ও চতুর্থ বিল উত্তোলনের জন্য পিআইসিদের ভিড় দেখা যায়। পিআইসিদের ডাক বাংলায় চলছে আনাগোনা, বিল উত্তোলনে দরকষাকষি ও দুর্নীতির মহোৎসব।
উপজেলার বিভিন্ন বাঁধে সরেজমিনে গিয়ে এমন বিপুল পরিমাণ বরাদ্দের প্রকল্প পাওয়া যায়। গত ২১ মে ভান্ডবিল উপ-প্রকল্পের এডিপি খাতের ১২নং পিআইসিভূক্ত প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, ৫শ’ ৪৫মিটারের সমতল স্থানের বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৪লাখ ২৯ হাজার, ৬৬৪ টাকা ৭৩ পয়সা।
ওই প্রকল্পের সদস্য সচিব মতিলাল চৌধুরী বলেন, প্রকল্প পেতে আমাকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডার পেতে ২হাজার, বিল তুলতে এসও শমশের আলীকে ১লাখ, আরো বিভিন্ন খাতে প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ২টি বিলের ১১লাখ টাকা দিয়েই শ্রমিকদের প্রাপ্য মুজুরী দিয়েছি। আবার আমাদেরও (পিআইসির লোকদের) কিছু লাভ হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ওই প্রকল্পের সভাপতি মনোরঞ্জন দাসকে গার্মেন্টস থেকে এনে প্রকল্পের সভাপতি করেছেন উপজেলা পাউবো প্রকল্প কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য ও মনোরঞ্জন দাসের নিকট আত্মীয় পীযুষ শেখর দাস।
তিনি একান্ত আলাপকালে নাম উল্লেখসহ বলেন, উপজেলার প্রভাবশালী অনেক নেতাসহ বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিগণ কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন। তিনি আরো মন্তব্য করেন পাউবোর পিআইসি গঠন থেকে শুরু করে বিলপ্রাপ্তি পর্যন্ত আমাদেরকে উৎকোচ দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে ভেড়াডহর হাওর উপ-প্রকল্পের আওতায় ভেড়াডহর খেয়াঘাট থেকে নরেশ অধিকারীর বাড়ি পর্যন্ত পিআইসি ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নং প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পৌনে ১কোটি টাকা। এ বিষয়ে ক’দিন পূর্বে সরেজমিন ওইসব বাঁধে গেলে ভেড়াডহর গ্রামের রঞ্জন চন্দ্র বৈষ্ণবসহ অনেকই বলেন, এখানে মাত্র ৮ থেকে ১০লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেই বাঁধ হতো। অথচ এখানে লুটপাটের জন্য অধিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তারা আরো বলেন, ৪৮নং প্রকল্পের সভাপতি নরেশ অধিকারীর প্রকল্পেও ২৪লাখ ১৭হাজার টাকার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এই ৪টি প্রকল্পেই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ওইসব প্রকল্পগুলো নরেশ অধিকারীর সিন্ডিকেটভূক্ত। তারা ফসলরক্ষার নামে সরকারের লাখ লাখ টাকা লুটপাট করার পাঁয়তারা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নরেশ অধিকারীর প্রতিবেশি বলেন, বাঁধের টাকা দিয়ে তিনি নিজের বাড়িতেও মাটি ফেলেছেন।
অনুসন্ধানে গেলে ওই গ্রামের ধনঞ্জয় বৈষ্ণব, বিধান চন্দ্র বৈষ্ণব, নিধূবন বৈষ্ণব, বিমল চন্দ্র বৈষ্ণব, হরেন্দ্র চন্দ্র বৈষ্ণবসহ অধিকাংশ গ্রামবাসী বলেন, অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণে এলাকার সেচ, ঘরবাড়ি ও জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখানে পুরানো বাঁধই গ্রামের চেয়ে অনেক উচুঁ ছিল।
তাছাড়া বরাম হাওর উপ-প্রকল্পের পিআইসি নং ২০ প্রকল্পেও প্রয়োজনের তুলনায় অধিক বরাদ্দ দেখা যায়। ওই প্রকল্পের ৩শ ৭৪মিটার দৈর্ঘ্য বাঁধে ২৩লাখ ৩হাজার ৫শ’ ৭২টাকা ৬৬ পয়সার প্রাক্কলন দেখানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাধারণ কৃষক জানান, এ বাঁধে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেই যথেষ্ট ছিল। পিআইসি নং ২৩-এর বাঁধেও অনুরূপ অধিক বরাদ্দ দেখা যায়। আরেক পিআইসির সভাপতি মনোরঞ্জন দাস ভান্ডাবিল হাওর পিআইসি নং ১৫ ওই প্রকল্পেও ১৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তিনি নিজেই হিসেব করেছেন ৫লাখ টাকাই তার বাঁধ হয়ে যায়। বরাম হাওরের ২১ নং পিআইসিতেও এধরণের প্রয়োজনের তুলনায় অধিক বরাদ্দ দেখা যায়।
উপজেলার মামুদনগর, শশারকান্দা, ফয়েজুল্লাপুর কুশিয়ারার ডানতীর, ভেড়াডহর থেকে গ্রাম শাল্লা, সাতপাড়া বাজার থেকে আদিত্যপুরসহ বিভিন্ন হাওরের বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় পিআইসিগুলোতে এ ধরণের অধিক আর্থিক বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া র্দূনীতিবাজ আরেক পিআইসি মোঃ লুৎফুর রহমান ও রয়েছেন অধরা। তার বাধেঁ রয়েছে ব্যাপক অনয়িম আর র্দূনীতি। তিনি দায়সারাভাবে কাজ করে না কের টাকা উত্তোলনের মহোৎসবে মেতে উঠেছেন। তিনি নাকি সাংবাদিকদেরও অকথ্যা ভাষায় কথা বলেন লিখে কেউ নাকি তার কিছুই করতে পারবে না ।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, যেখানে ২৪লাখ টাকা বরাদ্দের কথা সেখানে ৭ থেকে ৮লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আবার যেখানে ৭ থেকে ৮লাখ টাকা দেয়ার কথা সেখানে প্রাক্কলন দেখানো হয়েছে ২৩/২৪লাখেরও বেশী টাকা।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্প তৈরি থেকেই ঘুষ লেনদেন শুরু হয়েছে। তিনি বাহাড়া গ্রামের কালীপদ সরকার ছোট্টু’র নাম উল্লেখ করে বলেন, তাকে পিআইসি (প্রকল্প) পেতে উপজেলা কমিটির সদস্য পীযুষ শেখর দাসকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তিনি আরো জনান, এধরণের ঘুষ লেনদেন অনেক হয়েছে।
এব্যাপারে গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএমসি’র সম্মানিত সদস্য শশধর সরকার বলেন, ছায়ার হাওরের এলাকার একমাত্র ভাটিবাংলা কলেজটিকে রক্ষার জন্য আমরা আনন্দপুর গ্রামবাসি সম্মিলিতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি সুন্দর কমিটি দিয়েছিলাম। কিন্তু উপজেলা কমিটির সদস্য পীযুষ অবৈধ অর্থের বিনিময়ে গ্রামের বিতর্কিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পিআইসি অনুমোদন করিয়ে নেয়।
তিনি আরো বলেন, পীযুষ সম্পর্কে যদি বলতে হয়, তাহলে বলছি পীযুষ এক নম্বর অসৎ লোক।
সুনামগঞ্জ জেলা আওমীলীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট অবনী মোহন দাশ বলেন, এখানে রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট চক্র। আর দুর্নীতির কথা যদি বলি তবে এককথায় বলবো চরম দুর্নীতি হয়েছে শাল্লায়। জনগণ এসব দুর্নীতির সঠিক বিচার চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক বাদল চন্দ্র দাস বলেন, পীষূষ শেখর দাস শতাধিক লোকের কাছ থেকে লাখ লাখ হাতিয়ে নিয়েছে। গার্মেস্টস থেকে তার এক আত্মীয়কে এনে সেই কমিটিতে তাকে সভাপতি ও তার আপন ছোট ভাইকে সদস্য রেখে প্রকল্পের ২৪লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে। কিভাবে পাউবোর উপজেলা কমিটিতে সদস্য হলেন তিনি এ প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিক বাদল চন্দ্র দাস।
এব্যাপারে উপজেলা কমিটির সদস্য পীযুষ দাসের সাথে কথা হলে দাম্ভিকতার সাথে তিনি বলেন, মতিকে তো আমিই পিআইসি দিয়েছি। আর এসও লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাবে, আমরা কি কয়েক লাখ টাকা পাব না। আর ওইদিক দিয়া ইউএনও’য় অসুখের কথা কইয়্যা এক ভইগ্যলাম ধরছে, অখন বাসাত থাক্যাই টাকা গুণে।
এবিষয়ে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি ও জেলা বাঁধ মনিটরিং কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সোচ্চার। যদি সংশ্লিষ্ট কেউ দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক সালেহিন চৌধুরী শুভ মুঠোফোনে বলেন, দেশের জনগণ এ দুর্নীতিকে প্রতিরোধ করবে। প্রয়োজনে জনগণ সরকারি অর্থ আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন তিনি জানান। এরপূর্বে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গনেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেছিলেন এসব প্রকল্প ভাগভাটোয়ার জন্য করা হয়েছে।
পাউবোর বাঁধ নির্মাণ/মেরামত কাজে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ সার্বিক বিষয়ে সুনামগঞ্জ পওর-২ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খুশী মোহন সরকারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয় উপজেলা কমিটির। সংশ্লিট শাখা কর্মকর্তা ও ইউএনও কে জিজ্ঞাসা করুন।
তিনি আরো বলেন, আমরা চিঠির মাধ্যমে সময় সময় তাদেরকে সঠিকভাবে কাজ করার অনুরোধ করেছি। এখন যদি তারা নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্তয় ঘটায় তাহলে সে দায়-দায়িত্ব তাদের।
এবিষয়ে ৩০ মে শাল্লায় কর্মরত পাউবোর শাখা কর্মকর্তা শমসের আলীকে না পেয়ে তার সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাঃ মাছুম বিল্লাহ’র সাথে কথা বলতে কার্যালয়ে গিয়ে না পেয়ে তার মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
(আজকের সিলেট/৬ জুন/ডি/কেআর/ঘ.)