১০ মে ২০১৮
অতিথি প্রতিবেদক : সুনামগঞ্জের দিরাই-মদনপুর সড়ক সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তিন উপজেলার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই সড়কের কাজ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের মর্জি মতো করছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। অন্য একটি সড়কের পৌনে দুই কোটি টাকা আত্মসাতে দুদকের একাধিক মামলার আসামী ঠিকাদারই করছেন এ সংস্কার কাজ।
সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্য জানিয়ে এ সড়কের বরাদ্দকৃত অর্থও লুটপাটের আয়োজন চলছে বলে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অবশ্য, ঠিকাদার লুৎফুর রহমান দাবি করেছেন, এই কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেছেন, কাজের নামে যাতে লুটপাট না হয় এজন্যে আমরা কঠোর রয়েছি। অনিয়ম হলে অবশ্যই এ্যাকশন নেয়া হবে।
১৫ কিলোমিটারে বরাদ্দ ১৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা : সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দিরাই-মদনপুর সড়কের ২৬ কিলোমিটারের মধ্যে গত বছর ১১ কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার করা হয়। বাকি ১৫ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ১৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সে হিসেবে প্রতি কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে দেয়া হয়েছে প্রায় ৮৯ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা। ১৮ দশমিক ৪ ফুট প্রস্থের সড়কের সংস্কার কাজের কার্পেটিং ৪০ মিলিমিটার বা দেড় ইঞ্চিরও বেশি পুরত্বে করার কথা। ৮ মার্চ থেকে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্নের জন্যে কার্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে বলে সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন।
সড়কের ভাঙাচোরা গর্ত খুঁড়ে পুরাতন কার্পেটিং তুলে নতুন করে কার্পেটিং করার কথা রয়েছে বলে সওজ সূত্র জানিয়েছে। সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা ঠিকাদার লুৎফুর রহমান এই সংস্কার কাজটি পেয়েছেন।
কার্যাদেশ মানা হচ্ছে না : স্থানীয় একাধিক শ্রেণি-পেশার লোকজন অভিযোগ করে বলেন, কাজের মেয়াদের প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর গত মাসের ১৫ এপ্রিল থেকে কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এরপর সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের মদনপুর পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার, গণিগঞ্জ ও দরগাহপুর মাদ্রাসার মধ্যবর্তী, গাজীনগর গ্রামের অভ্যন্তরে ও শরীফপুরের দক্ষিণপ্রান্তের সংস্কার কাজ করা হয়। এসকল এলাকায় এক থেকে সোয়া ইঞ্চি পুরত্ব করে কার্পেটিং দেয়া হলেও গর্ত আগে খুঁড়ে- ভরাট করে পাথরের দ্বারা ভরাটের পর কার্পেটিং করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সরেজমিন পরিদর্শনেও এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। মদনপুর পয়েন্টের পশ্চিমে দেখা যায়, যেন রাস্তার উপর নামকাওয়াস্তে প্রলেপ দেয়া হয়েছে।
একইভাবে গাজীনগর পুরাতন মসজিদের সামনেও দেখা গেছে একই চিত্র। আবার কার্পেটিং এর পর সড়কের পার্শ্বের দিকের কার্পেটিং ভেঙে দেবে গেছে এমন চিত্র দেখা গেছে গাজীনগর এলাকায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, কাজের ধরণ দেখে মনে হয় ঠিকাদার বা তার লোকজন তাদের মর্জি মতোই কাজ করছেন। কার্যাদেশ মানা হচ্ছে না বলে মনে হয়, তারা অভিযোগ করেন।
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন : দিরাই-মদনপুর সড়কটি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, শাল্লা ও দক্ষিণসুনামগঞ্জ উপজেলাবাসীর যোগাযোগের একমাত্র সড়ক। এছাড়াও এ সড়ক দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার লোকজন নিয়মিত চলাচল করেন। এজন্যে এ সড়কটির গুরুত্বও অনেক। ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি ৩টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পড়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম.এ মান্নান এমপি’র নির্বাচনী এলাকায় সড়কের বেশির ভাগ অংশ পড়েছে। ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি’র নির্বাচনী এলাকায় পড়েছে বাকি অংশ। সামান্য অংশ পড়েছে এডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এমপি’র এলাকায়। ১৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার এই সংস্কার কাজের শুরুতেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপুল পরিমাণ অর্থ যেন কোনোভাবেই কাজের নামে লুটপাট করা না হয় এজন্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নজরদারীর দাবি জানানো হয়েছে।
কাজ করছেন দুদকের আসামী : সওজ সুনামগঞ্জের কোনো কর্মকর্তাই এই সংস্কার কাজ কোন প্রতিষ্ঠান করছে তা প্রকাশ করেননি। প্রথমে জন্মভূমি পরে রানা বিল্ডার্স ও এম.এম বিল্ডার্স’র নাম বলা হলেও সওজ-এর এস.ও নাজমুল চৌধুরী পরে বলেন, কাজটি জয়েন্ট ভেঞ্চারে চলছে। তাই, প্রতিষ্ঠানের নাম না বলাই ভালো। তবে ঠিকাদার লুৎফুর রহমানই কাজটি করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের সংস্কার কাজে অসম্পাদিত কাজকে সম্পাদিত দেখিয়ে সিলেট সড়ক বিভাগের ৭ কর্মকর্তার যোগসাজসে ঠিকাদার লুৎফুর রহমান ১ কোটি ৭৫ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬৭৬ টাকা আত্মসাত করেন। এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ঠিকাদার লুৎফুরসহ ৭ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গত ২৭ মার্চ মঙ্গলবার সিলেট মহানগর পুলিশের কোতয়ালী থানায় পৃথক মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। মামলা নং ৫৫ ও ৫৬। মামলার এজাহারে বলা হয়, দুদকের সরেজমিন তদন্তে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনাটি বেরিয়ে এসেছে।
সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক সংস্কার কাজের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের মামলার আসামীই দিরাই-মদনপুর সড়ক সংস্কারের কাজ করছেন। এজন্যে এই কাজের প্রতিও দুদকের নজরদারীর দাবি করছেন কেউ কেউ।
মান সম্মত না হলে আন্দোলন : এ বিষয়ে জাগো দিরাই’র সভাপতি আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, সড়ক সংস্কারে সরকার বরাদ্দ দেয়; কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু লোকজনের কারণে সরকারের চেষ্টা ম্লান হয়ে যায়। আর আমরা জনগণের দুর্ভোগ আর কমে না।
তিনি বলেন, এই কাজে অনিয়ম হলে আমরা আন্দোলনে নামব। প্রয়োজনে দুদকসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরেও যাব। সঠিক ও মান সম্মত কাজ হলেই আমরা খুশি হব।
ঠিকাদারের বক্তব্য : যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদার লুৎফুর রহমান বলেন, দশ-বারো দিন বা পনেরো দিন ধরে কাজ শুরু করছি। ৯ মাস সময় আছে। দেড় মাস চলে গেছে। কত টাকার কাজ করছেন এটা তার মুখস্থ নেই।
কাজে অনিয়মের ব্যাপারে তিনি বলেন, ১১-১২ কিলোমিটার কাজ আছে। ৪ কিলোমিটার আছে শুধু ওভার লে। ৪ কিলোমিটারে কোনো রিপেয়ার নেই। যেটা এখন আমরা করছি। বাকি অংশ বিটুমিন তুলে, পাথরের আলাদা প্রলেপ দিয়ে- রোল করে আবার কার্পেটিং হবে। এর জন্য হয়তো এসব (অনিয়ম) বলা হচ্ছে।
কাজ ঠিকমতোই হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, এখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। বরং কার্যাদেশের বাইরেও রিপেয়ারিং করছি। বাকি অংশের কাজ খুবই হেভি হবে।
কাজটি কোন প্রতিষ্ঠানের নামে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জন্মভূমির নামে কাজটি নয় অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের নামে তা তিনি বলতে পারেন নি।
তিনি বলেন, এখন বাইরে আছি। দেখে বলতে হবে কোন প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ পেয়েছি।
সওজ কর্মকর্তার বক্তব্য : এ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হোসেন চৌধুরী বলেন, এখন ভালো জায়গার কাজ হচ্ছে বলে হয়তো কেউ কেউ এমন (অনিয়ম) বলছেন। ভালো জায়গায় শুধু কার্পেটিং হচ্ছে। ভাঙাচোরা জায়গাগুলোতে গর্ত করে বিটুমিন তুলে হেভি করে কার্পেটিং করা হবে। কাজ সম্পন্নের পর বলা যাবে কাজ কত ভালো ও মানসম্মত হয়েছে। ৮ মার্চ থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে।
অনিয়ম হলে এ্যাকশন : সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা এ বিষয়ে বলেন, কাজের মান অবশ্যই ঠিক রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো আপস নেই। আমাদের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের ইতোমধ্যে কাজের মানের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কাজের নামে যেন লুটপাট না হয় এদিকে আমাদের নজরদারীও আছে।
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজ নেব। অনিয়ম হলে এ্যাকশন নেয়া হবে।
(আজকের সিলেট/১০ মে/ডি/কেআর/ঘ.)