১০ ডিসেম্বর ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : আজ রোববার ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের প্রতিবেদনে নানা তথ্য এসেছে ইতোমধ্যেই। তবে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে রয়েছে সে বিষয়ে জানতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো নেই। বাংলাদেশও মানবাধিকার অবস্থান নিম্নমুখী। এশিয়ায় নাগরিক অধিকার সংকুচিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মানবাধিকার রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার দিকে আঙুল তুলে বলেছেন, তাদের (জাতীয় মানবাধিকার কমিশন) তৎপরতা যথেষ্ঠ নয়।
তবে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মত ভিন্ন। তারা বলছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ এমনটা বলার অবকাশ নেই। মানবাধিকারকর্মীদের বেশিরভাগ বলছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকারের অবস্থান নিচে নেমে গেছে। এটি সুরক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারছে না।
এদিকে জোহানেসবার্গ-ভিত্তিক নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী সিভিকাস মনিটর ২০২৩ সালের সাম্প্রতিক এক বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যেসব দেশে এই মুহূর্তে নাগরিক অধিকার সবচাইতে সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে এর মধ্যে এমন ২৮টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও।
সিভিকাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এশিয়ায় নাগরিক অধিকার সবচাইতে সংকুচিত দেশের সংখ্যা আগে ছিল সাতটি- আফগানিস্তান, চীন, হংকং, লাওস, মায়ানমার, উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম। নতুন করে এদের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের নাম।
দেশের মানবাধিকার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারছেন না। জাতীয়ভাবে মানবাধিকার কমিশন ব্যর্থ হওয়ায় আর্ন্তজাতিক সংস্থা সেটি জাতিসংঘ হোক বা অন্য কোনো সংস্থা হোক তাদের জন্য সুযোগ করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের রূপ বদল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন হলেও এর গুণগত কোনো পরিবর্তন হয় নি। একেবারেই লোক দেখানো একটা পরিবর্তন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি ও মানবাধিকারলঙ্ঘন একসূত্রে গাঁথা। কারণ বিভিন্ন সময় গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব দেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যারা দুনীর্তির অবস্থানে খারাপ রয়েছে সেসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা বেশি। তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষার জন্য যে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে তাদের পেশাগত উৎকর্ষতা বাড়াতে হবে।
মানবাধিকার সম্পর্কে তথ্য ও মত প্রকাশের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিকেল ১৯- এর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সাল বলেন, মানবাধিকারে আগে আমরা (বাংলাদেশ) একটু ভালো অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু এবারের সিভিকাসের পর্যবেক্ষণে আমরা নিচে নেমে গেছি। নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সবগুলোই ক্ষুন্ন হচ্ছে।
আর্টিকেল ১৯- এর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক এই পরিচালক বলেন, ভোট দেওয়ার অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করতে পরামর্শ দিয়ে বলেন, দেশে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। আইন বিভাগকে প্রকৃত স্বাধীন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ সংস্কার করতে হবে।
এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পৃথিবীজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি মারাত্মক অবস্থায় আছে। সারা বিশ্বের সহিংসতাকেই আমি তীব্র নিন্দা জানাই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি খুব ভালো জায়গায় অবস্থান করছে বলে মনে হয় না। এর কারণ হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কথা বলতে গেলে চিন্তা করতে হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের।
এলিনা খান বলেন, সংবিধানে যে গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা চলাচলের স্বাধীনতার কথা আছে, এই জায়গা থেকে আমরা অনেক সমস্যার মধ্যে আছি। সমস্যা সমাধানে বিশেষ করে কখনও কখনও সরকার দলের দায়িত্ব নিতে হয়। সহিংতা এড়ানোর দরকার সব দলের। বিশেষ করে সরকারি দলের উস্কানিমূলক কোনো কাজ করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের চাহিদা খুব কম। তারা ছেলে মেয়ে নিয়ে একটু পেট ভরে ভাত খেতে চায়। এই খাওয়াটাই তো নিশ্চিত করতে পারছে না।
মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে না এমন কোনো সেক্টর খুঁজে পাচ্ছি না। এমনকি কোনো ব্যক্তির স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করার অধিকারও নেই। মত প্রকাশ করলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিংবা সামাজিক পর্যায়ে হোক সেই ব্যক্তিকে দমিয়ে রেখে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। আদালত কিংবা থানা যেখানেই হোক না কেন ব্যক্তি তার মানবাধিকার রক্ষা করার পরিবেশ পায় না। পরিবারের ছোট শিশুদের সুরক্ষা দেবার এমন কোনো কাঠামো নেই যাতে সে সুরক্ষিত থাকবে। ফলে শিশুকাল থেকে শুরু করে বড়বেলায়ও নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। যারা অর্থনৈতিকভাবে বা অন্যান্যা দিক থেকে দুর্বল তাদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। ফলে দরিদ্র হলে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দিক থেকে বলবো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির খারাপ এমন কোনো কিছু বলার অবকাশ নেই। বাংলাদেশ সৃষ্টিই হয়েছে মানবাধিকারের সংগ্রাম করে। মানবাধিকারের সংগ্রামের ফসল হলো বাংলাদেশ। গত ৫২ বছরে বিভিন্ন রকমের সমস্যা হয়েছে আবার উন্নয়নও হয়েছে। উন্নয়ন হলে মানুষ শান্তিতে থাকে আর এতে মানুষের অনেকগুলো অধিকার অর্জিত হয়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত যে হচ্ছে না বিষয়টা তা না। যেমন, নারী নির্যাতন বিভিন্ন সময় হয়ে থাকে। এর পিছনে মূল কারণ হল বাল্যবিবাহ। এই কারণে একটা মেয়ে তার ভবিষ্যত হারিয়ে ফেলে।