৮ মার্চ ২০১৮
অতিথি প্রতিবেদক : ঘনিয়ে আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করবে, না কি পৃথকভাবে অংশ নেবে এমন প্রশ্ন থাকলেও সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা-এরশাদ) ১০ নেতা মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আর এ নিয়ে কোন্দল আছে তিন দলেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতারা মনোনয়ন দ্বন্দ্বে এখন নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ।
এ আসনের বর্তমান এমপি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরীর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে আরও দুই নেতা মনোনয়ন পেতে চালাচ্ছেন লবিং-তদবির। একই অবস্থার কারণে বিএনপি থেকেও মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন চারজন। আর জাপায় মনোনয়নপ্রত্যাশী তিনজন। আর জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, এ আসনে তাদের কোনো দ্বন্দ্ব বা কোন্দল নেই। তাই তারা সিলেট-৩ আসনে একক প্রার্থী দেবেন।
আওয়ামী লীগ :
সিলেট-৩ আসনে মনোনয়ন পেতে টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা অনেকটাই আগ্রাসী। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে ভোটের আগেই এ আসনেই মনোনয়ন নিয়ে তুমুল লড়াই শুরু হয়েছে দলটিতে। আওয়ামী লীগের তিন নেতা মনোনয়ন পাওয়ার দাবিদার। এ নিয়ে দলে সৃষ্ট দ্বিধাবিভক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিএনপি ও জাপা। এ আসন থেকে টানা দুবার নির্বাচিত এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী নানা কারণে এলাকায় আলোচিত। তার বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের পাত্তা না দেওয়া ও জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ তুলেছে দলের একটি অংশ। চলতি মাসের শুরুর দিকে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনও করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রইছ আলী স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন যুগ্ম সম্পাদক সাহেদ হোসেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে উপজেলা আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে তছনছ করে দিচ্ছেন সামাদ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর কেন্দ্র করে চন্ডিপুল এলাকায় আওয়ামী লীগের বর্ধিতসভায় তার ইন্ধনে সংঘর্ষ হয়।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী বলেন, ২২ বছর ধরে আমি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। ১৯৬৮ সাল থেকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করি। এখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। উপজেলা কমিটির নামে সংবাদ সম্মেলন করা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী। সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই, এমন একজন কেন্দ্রীয় নেতা তার আসনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি বঞ্চিত হবেন, এ বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এখন দলের ভেতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টায় আছেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের কাছে বিচার চাইবেন বলে জানান এই এমপি।
এ আসনে মনোনয়ন লড়াইয়ে আছেন মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী এমপি, দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান হাবিব। তবে তিন নেতার মধ্যে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, আমি এবারও মনোনয়ন চাইব। দল এবং নেত্রী মনোনয়ন দিলে নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি আমি। তিনি আরও বলেন, গত দুবার এমপি হিসেবে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছি এলাকায়। জনগণের ভালোবাসা আর দলের জন্য কাজ করার কারণে আগামীতে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে আমি আশাবাদী।
অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, বিভিন্ন কারণে সিলেট-৩ আসনের সাধারণ মানুষ এবং তৃণমূল নেতাকর্মীরা আমাকে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আমি দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেব। তিনি আমাকে যে আসনে মনোনয়ন দেবেন, সেই আসন থেকেই নির্বাচন করব।
হাবীবুর রহমান হাবীব জানান, গত ১০ বছর ধরে সিলেট-৩ আসনের মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। জনপ্রতিনিধি না হয়েও অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করিয়েছি। নেত্রী আমাকে এলাকায় কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএনপি :
দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ফেলতে না পারায় বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী চার প্রভাবশালী নেতা বেরিয়েছেন। তারা হলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি শফি আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার এমএ সালাম, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল গফ্ফার, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
শফি আহমদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আমল থেকে বিএনপিকে বুকে লালন করে আছি। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড করেছি। দুর্যোগ মুহূর্তে দলের সঙ্গে বেঈমানি করিনি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি দল আমাকে মনোয়ন দেবে, বিজয়ও নিশ্চিত হবে।
ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নই ওঠে না। খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে তিনি আরও বলেন, দলের দুঃসময়ে তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এলাকার জনগণ পরিবর্তন চায়। এ হিসাবে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে বলেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে এলাকায় উন্নয়ন কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলাম। বর্তমানে তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এ হিসাবে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি।
জাপা :
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আতিকুর রহমান আতিক এ আসন থেকে আগে একবার নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি এবারও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। তার সঙ্গে পাল¬া দিয়ে মনোনয়ন দৌড়ে আছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও জেলা সদস্যসচিব উছমান আলী চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় সদস্য ও যুক্তরাজ্য জাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।
উছমান আলী জানান, ‘দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব অনেক আগেই আমাকে সিলেট-৩ আসনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত নির্বাচনেও আমাকে এ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তের কারণে আমি মানোনয়ন প্রত্যাহার করি। এবারও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশাবাদী। কারণ পল¬ীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছেন।
জামায়াত :
জামায়াতে ইসলামী এ আসনে একক প্রার্থী দেবে এবং দলীয় প্রার্থী এবং প্রতীক দিয়েই তারা নির্বাচন করতে চায়। এ পর্যন্ত আসনটিতে দুজন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুল্লা আল হুসাইন।
এ ব্যাপারে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি (দক্ষিণ) মাওলানা লোকমান আহমদ বলেন, ‘দল থেকে একক প্রার্থী দেওয়া হবে এবং সেই একক প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করার কথা। সবার সহযোগীতায় আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রার্থী হতে চাই।
(আজকের সিলেট/৮ মার্চ/ডি/এমকে/ঘ.)