৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
ডেস্ক রিপোর্ট : বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে বাপ-দাদার দেয়া নামটির পূর্বে ‘শেখ’ যুক্ত করেছিলেন ছবির এই মানুষটি। চুলের স্টাইলটাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুকরণেই। শুধু তাই নয় বেশির ভাগ সময় মুজিব কোট পরে থাকতেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুক ভরে আপা ডাকতেন। এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ কিংবা ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম হলে তিনি থাকতেন সবার আগে। অনুকরীয় এই ভালবাসা দেখানো মানুষটির নাম শেখ আব্দুর রশিদ (কালাই মিয়া)। যিনি নিজেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্র দাবি করতেন।
বঙ্গবন্ধুর স্ব-ঘোষিত পুত্র শেখ আব্দুর রশিদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাঙ্গাউটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। গত ২০১৬ সালের ২০ মার্চ তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় শেখ আব্দুর রশিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। শেখ আব্দুর রশিদ প্রধান মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, জিনিস পত্রের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন, গরীব মানুষ বাঁচবে কেমন করে? তিনি এও বলেন, আপা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) যদি আমাকে কাছে ডেকে নেন তাহলে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমি মন্ত্রী হতে চাই না, এমপি হতে চাই না,
শুধু বিশ্ব আমাকে দেখুক।
কথিত আছে ১৯৭০ সালের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বড়লেখা উপজেলা সফর করেন। সেই সময় বড়লেখা স্টেশন মাঠে আয়োজিত জনসভায় শেখ আব্দুর রশিদ কালাই মিয়া তাঁর সাথে দেখা করলে তিনি কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেন তোমার বাবা কি করেন? উত্তরে কালাই মিয়া বলেছিলেন -আমার বাবা নেই।
বঙ্গবন্ধু বললেন, আজ থেকে আমি তোমার বাবা। সেই থেকে আব্দুর রশিদ কালাই মিয়া নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সন্তান ভাবতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালবাসার পরিধি বেড়ে যায় বহুগুণ।
সরেজমিনে শেখ আব্দুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর অসংখ্য ছবি লেমিনেশন করে রাখা এবং প্রায় ছবির সাথে শেখ আব্দুর রশিদ নিজের ছবিও রেখেছেন। ইংরেজী ভি চিহ্ন প্রদশন করে তিনি সবসময়ই নিজের দলের সফলতা কামনা করেছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রায় ৬শত ছবির বিশাল সংগ্রহ ছিল শেখ আব্দুর রশিদের বাড়িতে। তার মৃত্যুর পর কিছু ছবি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু ছবি চুরি হয়ে যায়।
‘মাথা খারাপ’ কালাই মিয়ার কথা বার্তা অসংলগ্ন হলেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি তাঁর ছিল নিখাঁদ ভালবাসা। স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে এর বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে কিংবা প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাড়িতে আসবেন এমন কথা বলে অনেকেই তাকে দিয়ে কাজ হাসিল করে নিতেন।
কেউ কেউ আবার বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর সাথে ঠাট্টা-মশকরা করতেন। যে যাই বলুক না কেন শেখ আব্দুর রশিদ (কালাই মিয়া) বঙ্গবন্ধুর পুত্র এবং প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাই পরিচয় দিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করতেন।
শেখ আব্দুর রশিদ সম্পর্কে গ্রামবাসীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তাকে সবাই শেখের পুত্র হিসেবে চিনতেন। মাথায় কিছুটা সমস্যা থাকায় তিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধুর প্রেমে মশগুল থাকতেন বলেই আয়রোজগারে খুব একটা মনোযোগ ছিলনা না তাঁর। তবে সত ঘরের হাঁস-মুরগির ডিম বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতেন শেখ আব্দুর রশিদ। ডিম বিক্রি করে যা উপার্জন হতো তাতে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি কিনে লেমিনেটিং করতেন এবং অবশিষ্ট টাকা দিয়ে সংসার খরচ চালাতেন। ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার বলতে তিনি
একা। পরে তার চাচা আছার উদ্দিন ও স্থানীদের সহযোগিতায় অনেকটা জোর করেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির ইন্তেকালের পর অসহায় এবং মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাঁর স্ত্রী রিমা বেগম ও শিশু কন্যা তায়্যিবা বেগম।
১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু বড়লেখা উপজেলা সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় সংসদের হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, শেখ আব্দুর রশিদকে আমরা সব সময় সাহায্য-সহযোগিতা করেছি। তাঁর স্ত্রী আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে অবশ্যই আমরা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব।
বড়লেখা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ বলেন, শেখ আব্দুর রশিদ আমার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাঙ্গাউটি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রেমিক এবং আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। শেখ আব্দুর রশিদের ভাষ্য দিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন বড়লেখা রেল স্টেশন মাঠের জনসভায় আসেন তখন আব্দুর রশিদ তাকে বাবা বলে ডেকেছেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে বঙ্গবন্ধুই তাঁর পিতা। এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি বোন বলে ডাকতেন।
এছাড়াও সোহয়েব আহমদ জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ের অগ্রভাবে শেখ আব্দুর রশিদ বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়ে উপস্থিত থাকতেন।
সোয়েব আহমদ শেখ আব্দুর রশিদের পরিবারকে নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতা করেন পাশাপাশি তিনি সকল নেতাকর্মীদের প্রতি জানান সবাই যেন এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফারুক আহমদ জানান, শেখ আব্দুল রশিদ জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ভালবেসেছেন। নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি কিনেছেন।
মিছিল মিটিংয়ে যোগ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারকে ভালবাসার এমন নজির আর কেউ দেখাতে পাইনি। তিনি বলেন, শেখ আব্দুর রশিদ মারা যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছে তাঁর স্ত্রী আর কন্যা শিশুটি। স্বামীকে খুব বেশীদিন ধরে রাখতে পারেননি রিমা বেগম। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন। স্বামী শেখ আব্দুর রশিদকে নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ নেই।
কোথাও পরিচয় দিতে হলে বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ আব্দুর রশিদের স্ত্রী রিমা বেগম।
স্বামী মারা যাওয়ায় দিশে হারা হয়ে পড়েছেন। একমাত্র কন্যার ভবিষ্যৎ চিন্তায় অস্থির রিমা বেগম প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, বঙ্গবন্ধু আর হাসিনা হাসিনা করেই আমার স্বামীর জীবন গেল। আজ মেয়ের ভবিষ্যৎ নাই আমার কিচ্ছু নাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন আমার মেয়ের জন্য কিছু করুন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রীকে এলাকা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল যে ভ্যান চালক তাঁর দিন ফিরে গেছে, ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজকে তার সফলতার জন্য বাড়ি বানিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই তুলনায় বঙ্গবন্ধু পরিবারকে ভালবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শেখ আব্দুর রশিদ রয়ে গেলেন অন্তরালে। তাঁর স্ত্রী-সন্তান আজ অসহায়। প্রধানমন্ত্রীর সু-নজরে অসহায় স্ত্রী-কন্যার জীবন বদলে যাবে এমনটাই আশা করছেন স্থানীয়রা।
(আজকের সিলেট/৬ ফেব্রুয়ারি/ডি/এমকে/ঘ.)