১৩ অক্টোবর ২০২২


একটি আসনের নির্বাচনেই হোঁচট খেল ইসি

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : ব্যাপক অনিয়ম আর জালিয়াতিসহ পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বুধবার দুপুরের আগেই গোপন কক্ষে ‘ডাকাত’ রুখতে না পেরে প্রথমে ৫১ কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। দুপুরের পর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমে গ্রহন করা উপনির্বাচনের পুরো ভোটই বন্ধের ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।

বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুনঃতফসিল দাবি করেছে জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে ঢাকায় বসে ফুটেজ দেখে ভোট স্থগিত করার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। আর এই উপনির্বাচনে ইসিকে অসহযোগিতা করে সরকার সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসির সামনে আরও অনেক বড় অগ্নিপরীক্ষা রয়েছে। কারণ একটি মাত্র আসনে নির্বাচন করতে গিয়েই হোঁচট স্বাধীন এই সংস্থাটি। ৩০০ আসনে নির্বাচন করতে গিয়ে তারা কত বড় ধাক্কা খাবে, তার প্রাথমিক ট্রায়াল ছিল এই উপ-নির্বাচন। তারা বলেন, ১-২টি আসনে সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করে ভোট জালিয়াতি বা কারচুপি ধরা গেলেও ৩০০ আসনে নির্বাচন কমিশন সেই কাজটি করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইভিএমে ভোটারের পরিচয় শনাক্তের পর গোপন কক্ষে থাকা ব্যক্তি নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দেয়ার অভিযোগ আসতে থাকে। নির্বাচন কমিশন একাধিকবার এই ব্যক্তিদের ‘ডাকাত’ উল্লেখ করে বলেছে, ডাকাত ঠেকানোই তাদের চ্যালেঞ্জ। তবে এই ডাকাত ঠেকানো যায়নি।

১৪৫টি কেন্দ্রে স্থাপন করা এক হাজারেরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ ঢাকায় বসেই পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচন কমিশন। এরপর একে একে ৫১টি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়।

সাঘাটা-ফুলছড়ি নিয়ে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে মাহমুদ হাসান রিপন, জাতীয় পার্টির এএইচএম গোলাম শহীদ (লাঙ্গল), বিকল্প ধারার জাহাঙ্গীর আলম (কুলা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান (আপেল), স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান (ট্রাক) প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেন। দুপুরের দিকেই নৌকার প্রার্থী ছাড়া বাকি চার জন ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

নির্বাচনে অনিয়মকারীদের ‘ডাকাত ও দুর্বৃত্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সিইসি বলেন, যারা আইন মানে না তাদেরকে আমরা ডাকাত বলতে পারি, দুর্বৃত্ত বলতে পারি। ভোটে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের দায়দায়িত্ব খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

সিইসি সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রথমে নানা অনিয়মের কারণে ৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পুরো নির্বাচনি এলাকায় ভোটগ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার। বন্ধ হওয়া ভোটের বিষয়ে আইন পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এক আসনে এই দশা, ৩০০ আসনে কী হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এটা সময় বলে দেবে। একটি আসনে ঠিক হয় নাই, তিন শ আসনে ঠিক হবে না এটা বলা সমীচীন হবে না। এই আসনের নির্বাচন দিয়ে আমরা কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারব। আমাদের জন্য আগামীর নির্বাচন যাতে আরো সুন্দরভাবে করতে পারি, সেটার একটা দিক নির্দেশনা এখান থেকে পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতেরটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে।’

পুনঃতফসিল হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী। আমরা বলেছি, যে বিধিবিধান আছে আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, সেটি অবশ্যই জানানো হবে।’

ইভিএমের কারণে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে সিইসি বলেন, ‘ইভিএম নয়, এখানে কতগুলো হিউম্যান এলিমেন্টস রয়েছে। যান্ত্রিক কিংবা মেকানিকাল সমস্যা আমরা দেখি নাই। মেশিন কাজ করছে না, তা নয়। কোনো প্রার্থী কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রভাব আছে কিনা অনুসন্ধান ছাড়া বলা যাবে না।’

তবে ঢাকায় বসে ফুটেজ দেখে ভোট স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইসি কীভাবে নিল প্রশ্ন তুলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেখানে কোনো কেন্দ্রেই নৈরাজ্য হয়নি। ঢাকায় কমিশন ভবনে বসে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এতগুলো কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইসি কীভাবে নিলো তা বোধগম্য নয়।’

জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন স্থগিত করায় নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে এ উপজেলায় নির্বাচনের পুনঃতফসিলেরও দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে উপনির্বাচনে ইসিকে অসহযোগিতা করে সরকার সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে রব বলেন, ‘একটি উপনির্বাচনে ব্যর্থ ইসি ৩০০ আসনে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে অক্ষম।’

এদিকে বুধবার বিকেলে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকারের নিজেদের গঠন করা নির্বাচন কমিশনের কথা ডিসি-এসপিরাও শোনে না। এই কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না।’

উল্লেখ্য, গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপ-নির্বাচনে ১৭টি ইউনিয়নের ১৪৫টি কেন্দ্রের ৯৫২টি বুথে ইভিএম-এ ভোটগ্রহণের জন্য ১৪৫ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ৯৫২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও এক হাজার ৯০৪ জন পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। নিরাপত্তার জন্য প্রতি কেন্দ্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৪ জন পুলিশ সদস্য এবং ১২ জন আনছার ও ভিডিপি দায়িত্বপালন করেন। ১৪৫টি ভোট কেন্দ্রে স্থাপন করা হয় ১ হাজার ২৪২টি সিসি ক্যামেরা। এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৩৯ হাজার ৯৮ জন।

শেয়ার করুন