৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : নগরীর অভ্যন্তরে পুকুর-দীঘিসহ জলাশয় সংরক্ষণে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)’র উদ্যোগে দীর্ঘ এক বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ৩০ দিনের মধ্যে সকল জলাশয়ের তালিকা জমা দেয়ার কথা থাকলেও এর কোনো অগ্রগতিই হয়নি। সিসিক’র এই কার্যক্রম কেবল কাগজে কলমেই আটকে আছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সিসিক কাগজে কলমে কমিটি গঠন করলেও তা বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ নেই।
যোগাযোগ করা হলে এ সংক্রান্ত কমিটির আহবায়ক ও সিসিকের আরবান প্ল্যানার মো. তানভীর রহমান মোল্লা এ বিষয়ে সিলেটের ডাককে জানান, আগে সিসিক’র ওয়ার্ড ছিল ২৭টি। এখন আরও ১২টি ওয়ার্ড বেড়েছে। জুন মাসে আমাদের অনেক ঝামেলাও ছিল। এসব কারণে তালিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবারও কাজ শুরু করা হবে।
কমিটির সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিলেট নগরীর পুকুর-দীঘিসহ জলাশয় সংরক্ষণের জন্যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এতে আমাকেও সদস্য রাখা হয়। একটি সভাও হয়েছিল। এরপর আর কোনো খবর নেই। উদ্যোগটি ভালো ছিল কিন্তু এর বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়। লোক দেখানো কমিটি করা হয়েছিল বলেই আহ্বায়ক পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে কোনো কথাই বলেননি। অথচ নগরীর জলাশয় সংরক্ষণ করা কতোটা জরুরি তা এখন অনুধাবন করা যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা করে সুন্দর নগরী গড়তে হলে জলাশয় রক্ষা করা জরুরি।
কমিটির আরেক সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, কমিটি গঠনের পর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আমরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেই। সভায় সিসিক একটি তালিকা দেয়। আমরা নতুন-পুরাতন সকল ওয়ার্ডের পুকুর দীঘিসহ জলাশয়ের তালিকা তৈরি করতে বলেছিলাম। কাউন্সিলরগণদের মাধ্যমেও তালিকা তৈরি করতে আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছি। বলা হল দু’সপ্তাহ পরে পরবর্তী সভা হবে। এরপর কত দু’সপ্তাহ পেরিয়ে গেল কিন্তু সভা আর হয়না। কার খবর কে নেয়। আমরা সত্যিকার অর্থে সিসিক’র উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। সব ছিল কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। নতুন ওয়ার্ডসমূহে অনেক পুকুর, দীঘি- জলাশয় রয়েছে। এগুলোর তালিকা এখন করা গেলে এগুলো রক্ষা পাবে। না হয় একসময় প্রভাবশালীরা ভরাট করে ফেলবে।
কমিটির অপর সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, সিলেট মহানগরের পুকুর দীঘিসহ সকল জলাশয় সংরক্ষণে সিসিক একটি কমিটি গঠন করে। ইতোমধ্যে কমিটির মেয়াদ প্রায় এক বছর হয়ে যাবে। কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, বেলা, বাপা ও সুজনের প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়। কিন্তু আজও কমিটির সদস্যরা জানেন না কেন, কি কারণে কোনো কাজ করা হচ্ছে না। কমিটির সদস্য হিসেবে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চিঠিও দিয়েছিলাম, কোনো জবাবও দেয়া হয়নি। বার বার চিঠি দিয়েও কমিটির কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে পারিনি। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক। কেবল কাগজে কলমে নয়, আমরা সিলেটের পরিবেশ রক্ষায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন চাই।
সূত্র জানায়, গেল বছরের ১০ নভেম্বর সিলেট নগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ৬ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আরবান প্ল্যানার মো. তানভীর রহমান মোল্লাকে আহবায়ক, পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান, বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী ও বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তারকে সদস্য এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উপ-সহকারি প্রকৌশলী বিজিত চন্দ্র দে- কে সদস্য সচিব করা হয়। ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিসিকের অভ্যন্তরের জলাশয় সংরক্ষণে করণীয় বিষয়ে সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সিলেট মহানগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহে কমিটি গঠন করা হল মর্মে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কমিটি গঠন সংক্রান্ত পত্রে উল্লেখ করেন। ৩০ দিনের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন পূর্বক সিলেট নগরীর পুকুর-দীঘিসহ সকল জলাশয়ের তালিকা সংগ্রহ করে মেয়রের নিকট জমা প্রদানের জন্য ওই পত্রে অনুরোধ করা হয়েছিল।
নগরবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় সিলেটকে পুকুর বা দীঘির শহর বলা হত। ধোপাদীঘি, সাগরদীঘি, লাল দীঘি, বেকাদীঘি, রামেরদীঘি, কাজী দীঘি, মাছুদীঘি, রামুদীঘি, চারাদীঘি, মজুমদারদীঘি, তেররতনদীঘি, কাস্টঘর দীঘি, জয়নগর দীঘি, রাজবাড়ী দীঘি, লালা দীঘিসহ অনেক দীঘি ছিল। লালদীঘি ভরাট করে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা মিউনিসিপ্যাল মার্কেট নির্মাণ করেছিল। যা বর্তমানে সিটি সুপার মার্কেট হিসেবে পরিচিত। বেকা দীঘি ভরাট করে সিলেট পৌরসভা গড়ে তুলে জালালাবাদ পার্ক। ধোপাদীঘি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় বেশ কিছু দোকানপাট। ওই দীঘির একাংশ ভরাট করে সিটি কর্পোরেশন পার্ক (ওসমানী শিশু পার্ক) ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি দীঘির চারদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। দীঘি সংলগ্ন এলাকায় বহুতল মার্কেটের নির্মাণ কাজ এখনো চলমান রয়েছে। চারাদীঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদ। ওই স্থানে একটি স্কুল নির্মাণেরও কথা রয়েছে। উত্তর কাজিটুলায় বিশাল দীঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বিদ্যুৎ অফিসের ভবন।
জানা গেছে, সিসিকের মোট জলাভূমির পরিমাণ ১ হাজার ৩৫৬ দশমিক ৩০ একর বা ৫৪৮ দশমিক ৮ হেক্টর। এর মধ্যে পুকুর, দীঘি, খালও রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে কেউ কেউ বলছেন এক সময় সিলেট নগরীর অভ্যন্তরে শতাধিক পুকুরও ছিল।
সিসিক’র তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে পুকুর-দীঘির সংখ্যা ২৮টি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার তথ্য অনুযায়ী, এর সংখ্যা ৩৬টি। গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী রচিত বাংলাদেশের বিলুপ্ত ‘দীঘি-পুষ্করিণী-জলাশয়’ বইয়ে ৬০টি পুকুর-দীঘির নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে এখনো কয়েকটি দীঘি-ছড়া ও পুকুর টিকে আছে। যেগুলো আপৎকালে নগরীর মানুষের একমাত্র ভরসা হিসেবে কাজে লাগে। গেল ২০২০ সালের নভেম্বরে নগরীর কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন লাগার পর এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে সময় টানা ৫৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন নগরীতে টিকে থাকা কয়েকটি পুকুরের পানি নগরবাসীর একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিল।