২২ জুলাই ২০২২
অতিথি প্রতিবেদক : কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিগত কয়েক বছর অস্থিরতার পর এবছর কিছুটা স্বস্তি এসেছে কাঁচা চামড়ার বাজারে। আকার ভেদে ২শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় ২ লক্ষাধিক চামড়া সংগ্রহ করেছেন সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরা। লবণ দিয়ে সংরক্ষিত চামড়া ট্যানারির মালিকদের নিকট বিক্রির অপেক্ষায় আছেন তারা। চামড়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে চামড়া ট্যানারির নিকট বিক্রি ও টাকা না পাওয়া পর্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে আছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চামড়া ব্যবসায়ী ছাড়াও ক্ষুদ্র ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরাও কোরবানিদাতাদের নিকট থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেট জেলায় প্রায় দেড় লক্ষ চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের আরো প্রায় ৫০ হাজারের উপরে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। চামড়ার আকার ভেদে প্রতিটি চামড়া ২শ’-৬শ’ টাকায় ক্রয় করেছেন ব্যবসায়ীরা। পরে সেই চামড়া লবণ দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করেন। কিছু দিনের মধ্যে ট্যানারির মালিকরা চামড়া ক্রয় করতে আসবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। খুব সামান্য মুনাফা হলেও তারা চামড়া বিক্রি করে দেবেন বলে জানান। ট্যানারির নিকট গত বছরের বকেয়া টাকা পেলেও এর পূর্বের বকেয়ার টাকা এখনো পাননি বলে জানান তারা।
সুনামগঞ্জের জাউয়াবাজারের ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন জানান, চামড়া ব্যবসা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। বিগতদিনে ক্রয়কৃত চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলে মনে হচ্ছে। সুনামগঞ্জে কোরবানিদাতাদের নিকট থেকে আকার ভেদে ২শ’ থেকে ৪শ’ টাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয় করেছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে, মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, লবণ সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য তাদের অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বালিকান্দি চামড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা ঠেলাগাড়ি বোঝাই করে চামড়া মনু নদীতে ফেলে দিয়েছেন বলে জানান।
বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ি সমিতির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ঈদ এলে আমরা আশা করি ব্যবসা করবো। কিন্তু, একেক বছর একেক সমস্যা দেখা দেয়। ট্যানারি সিন্ডিকেট তো আছেই; এবার লবণের দাম বেড়ে প্রতি বস্তা ১১শ’ থেকে ১৩শ’ টাকা বিক্রি হয়েছে। এর সাথে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় তাদের অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে। পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ভয়ে এগুলো নদীতে ফেলে দিতে হয়েছে।’
বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজ মোঃ আনোয়ার বলেন, এ ব্যবসা করে আমরা পথের ভিখারি হয়ে গেছি। প্রতি বছর লোকসান দিয়ে আর টিকে থাকা যাচ্ছে না। এবার ঈদের ৩ দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে বালিকান্দি গ্রামে বিদ্যুৎ থাকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে।
সিলেটের সবচেয়ে পুরনো চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র দক্ষিণ সুরমার কদমতলীর ব্যবসায়ী ও শাহজালাল লেদার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. শাহিন আহমদ জানান, সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় চামড়া ক্রয় করেছেন। বিগত দিনে ধারাবাহিক লোকসানে চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকেই পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে বিনিয়োগকৃত টাকা ট্যানারি মালিকদের নিকট থেকে আদায়ের জন্য ব্যবসায় টিকে আছেন।
তিনি বলেন, চামড়া ক্রয়ের পর সংরক্ষণে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। লবণের বস্তা প্রতি দাম ২শ’ থেকে ২৫০ টাকা বেড়ে গেছে। তাছাড়া, চামড়া সংরক্ষণ কাজে দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতা ও মজুরিও অনেক বেশি। এখন সরকার চামড়া ব্যবসার প্রতি নজর না দিলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, এক সময় কোরবানি দেওয়ার সাথে সাথে চামড়া ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি হাজির হয়ে চামড়া ক্রয়ের অগ্রিম টাকা দিয়ে আসতেন। কিন্তু, বিগত কয়েক বছর ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে উল্টো চিত্র। এমনও বছর গেছে, যে বছর চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা মিলেনি। কোরবানিদাতা ও সংগ্রহকারীরা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে চামড়া রাস্তায় ফেলে গেছেন কিংবা নদীতে নিক্ষেপ করেছেন-সিলেটে এমনও নজির রয়েছে। কেউ কেউ বাড়িতেই গর্ত করে চামড়া পুঁতে ফেলতেন। তবে এবছর ব্যবসায়ীরা চামড়া ক্রয় করে সংরক্ষণ করেছেন। ট্যানারির নিকট বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত হলে চামড়ার বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।