২০ জুলাই ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : রিজার্ভ সংকোচন বা কমে যাওয়াসহ নানামুখী আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে সরকার। যে রিজার্ভ নিয়ে এত দিন খুব উচ্ছ্বাস ছিল, সেই রিজার্ভও কমে আসছে। গত কয়েক মাসে ক্রমান্বয়ে কমছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। এতে বাজেট বাস্তবায়নও অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে।
খাতা কলমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বাস্তবে রিজার্ভের পরিমাণ কত- এ হিসাব নিয়ে আছে দুই রকম বক্তব্য। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকৃত রিজার্ভের অঙ্ক ৩২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তি হিসাবে তারা বলছেন, ৭ বিলিয়ন ডলারের রিপ্তানি আয় তহবিল (ইডিএফ), সবুজ রূপান্তর তহবিল বা জিটিএফ এবং শ্রীলঙ্কার ঋণ বাদ দিলে প্রকৃত রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
প্রশ্ন হলো এই অর্থ দিয়ে কয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত মজুদ ৩২ বিলিয়ন ডলার। এ মজুদ দিয়ে চার মাসের কিছু বেশি চলা যাবে। এর সঙ্গে সেবা খাতের দায় পরিশোধ, সরকারি-বেসরকারি ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ যোগ করলে আমদানির জন্য আরও কম রিজার্ভ থাকবে। এখন পর্যন্ত রিজার্ভের লেভেল ঠিক আছে। তবে আরও কমে গেলে তা হবে উদ্বেগের, এবং এ নিয়ে শঙ্কা আছে।’
ড. মনসুর বলেন, ‘গত বছর এই সময়ের কথা যদি বলি তাহলে বলতাম আমাদের রিজার্ভ ছিল আট মাসের। রিজার্ভ কমতে কিন্তু সময় লাগে না।’ রিজার্ভ উচ্চতায় নেওয়া বা সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। বিদেশ থেকে অর্থপ্রবাহ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদও বাড়ে। অন্যদিকে রপ্তানি আয়ও ভূমিকা রাখে।
বর্তমান যে সংকট এই বিষয়ে সিপিডির বিশেষ ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি সংস্কার পদক্ষেপও নিতে হবে। এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা যেন ভুলে না যাই। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ছে। কিন্তু কর-জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশ খুবই নিচের দিকের একটি দেশ।’
এ দেশে প্রকল্প যথাসময়ে শেষ করা যায় না, এতে খরচ বাড়ে- এ কথা উল্লেখ করে সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, ‘ফলে প্রকল্পের সুবিধা নেওয়া যাচ্ছে না, যা সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প সাশ্রয়ীভাবে সুশাসনের সঙ্গে বাস্তবায়ন করার তাগিদ থাকতে হবে।’
রেমিট্যান্স অন্তত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বলেন, ‘এতে নিট টাকাটা যোগ হয়। ইনফরমাল চ্যানেলে না গিয়ে কার্ব মার্কেটের সাথে ইনসেন্টেটিভসহ যেটা আমরা দিচ্ছি, সেটা যাতে পার্থক্য বেশি না হয় এদিকেও আমাদের নজর দিতে হবে।’
তবে সরকার এখনই আর্থিক সংকট পড়ে গেছে বলে মনে করেন না পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে টাকাটা আসে, সেটা আমাদের নিট মুনাফা। নতুন নতুন শ্রমিক আমরা দেশের বাইরে পাঠাচ্ছি। এতে খুব তাড়াতাড়িই রেমিট্যান্সে একটা ভালো প্রবাহ বাড়বে। এছাড়া রপ্তানিতেও ভালো করছে বাংলাদেশ।’
এদিকে ডলারের সংকট মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিনিয়ত দামও বাড়ছে ডলারের, এর বিপরীতে দুর্বল হচ্ছে টাকা। তবে রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়নি এমনটাই বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রিজার্ভ দিয়ে তিন মাস পর্যন্ত আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলে, তখন পর্যন্ত শঙ্কা থাকে না। আমাদের রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ডলারের বাজার স্বাভাবিক রাখতে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি আরও কঠোর করা হয়েছে। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ নিতে পারবে। ব্যাংকগুলো এখন তাদের আমদানির খরচ মেটাতে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিতে পারবে। রপ্তানিকারকের রিটেনশন বা প্রত্যাবাসন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে জমা করা বিদেশি মুদ্রার ৫০ শতাংশ অনতিবিলম্বে নগদায়ন করতে হবে।’
জানা গেছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাংলাদেশে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ ৩০ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছরে একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। আর পুরো অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল ২২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে কখনো এত বড় বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়েনি দেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ে এখনই শঙ্কার কারণ নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) বিল পেমেন্ট করার পর রিজার্ভ কিছুটা কমে গেছে। এতে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে অবশ্যই এ সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় বন্ধ করতে হবে।’
রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া, রিজার্ভ থেকে অন্য খাতে টাকা ব্যবহারে আরো বেশি সতর্ক হওয়া কিংবা পারলে ব্যবহার না করাই উত্তম হবে বলে জানান সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন।
তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়নের নিচে নামা সবার জন্য একটা সতর্কবার্তা বলে জানান বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তবে তা কেটে যাবে বলেও আশাবাদী তিনি।
ড. জাহিদ বলেন, ‘এখানে কাউকে একা দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ, করোনা শেষ হওয়ার পর আমদানির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এসব কিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।’
এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমদানি ব্যয় কমাতে ইতোমধ্যে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার প্রভাব কিছুদিন পর দেখতে পাব। তার আগে বৈদেশিক বাজেট সহায়তা এলে রিজার্ভ কিছুটা বাড়বে। তখন শঙ্কাও কেটে যাবে।’
এদিকে বাজার স্থিতিশীল করতে গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় নতুন অর্থবছরেও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এতে করে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১৮ দিনে (১ থেকে ১৮ জুলাই) ৬৮ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে বাজার থেকে ৬ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৯৩ টাকা ৯৫ পয়সা) তুলে নেয়া হয়েছে।