২ জুলাই ২০২২
ডেস্ক রিপোর্ট : ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত সিলেটে গত ৩ দিন ফের বাড়ছিলো পানি। কোথাও এক ফুট, আবার কোথাও দুই ফুট। বাড়িঘরও ডুবতে শুরু করেছিলো। এ অবস্থায় সিলেটের লাখ লাখ মানুষ ফের পড়েছিলেন উদ্বেগ-উৎকন্ঠায়। পড়েছিলেন অনিশ্চয়তার অতল সমুদ্রে। অল্প কিছু মানুষ যারা বাড়ী-ঘরে ফেরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ফের ছুটাছুটি শুরু করেছিলেন। তবে আশার খবর হলো শুক্রবার সিলেট-সুনামগঞ্জে বাড়েনি পানি। পরিস্থিতি স্থিতিশীল। তবে পানি না বাড়লেও বন্যার ভয়াবহতা কমেনি। কারণ এখনো ডুুবে আছে গ্রামের পর গ্রাম। পানি নামছে ধীরে। এতে হয়তো এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষের ঈদ কাটবে অন্যের বাড়ী কিংবা আশ্রয় কেন্দ্রেই! এমন আশঙ্কা বানভাসীদের।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, শতাব্দির প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানি যতটুকু নেমেছিল, গত বুধ-বৃহস্পতিবারের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ততটুকু আবার পূর্ণ হয়েছে। এ অবস্থায় কষ্টের পরিধিও বেড়েছে কয়েকগুণ। বন্যা কবলিত অনেকের সাথে আলাপ করে এ তথ্য জানা যায়।
সালুটিকর এলাকার বাসিন্দা আলেয়া খাতুন। প্রবল ঢলের কারণে তিনি ১৬ জুন সাঁতরে উঠেছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। টানা ১০ দিন স্কুলে অবস্থান করেন। পানি নামায় গত মঙ্গলবার বাড়ি ফিরেন। ঘর বিধ্বস্ত। এরপরও তিনি বসবাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু বুধবার দুপুরে ফের তাঁর ঘর প্লাাবিত হয়। এতে আলেয়া বেগম ফের কোমর পানি ঠেলে নিরাপদে ছুটছিলেন। জানালেন- ‘তিন দিন আগে বাড়ি গিয়েছিলাম। ঘরে পানি উঠে গেছে। এখন আবার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠতে হবে।’ একই অবস্থা গ্রামের আব্দুল খালেকের। সড়কের পানি ডিঙ্গিয়ে উঁচু স্থানে ফিরছিলেন। পেছনে পড়ে থাকা বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত। তিনিও জানান, ফের ঘরে পানি। বসবাস করা যাবে না। উঠতে হবে আশ্রয়কেন্দ্রে। শুধু আলেয়া কিংবা আব্দুল খালেক নয়, সিলেটের লাখ লাখ মানুষ বুধবার থেকে ফের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। নতুন করে জেগে ওঠার আশায় বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু ২ দিনের বৃষ্টি তাঁদের সব এলোমেলো করে দেয়। তবে শুক্রবারের মতো বৃষ্টি কিছুটা থামলে হয়তো আবারো ভেসে উঠতে পারে তাঁদের ভিটে। নয়তো অনিশ্চয়তার অন্ধকারেই ডুবে থাকতে হবে আলেয়াদের মতো বানভাসীদের।
ওসমানীনগরের খন্দকার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া সমুজ আলী বলেন, তাঁর ঘরে হঠাৎ কোমর সমান পানি হয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরের সব। নষ্ট হয়ে যায় ধান। এ অবস্থায় আশ্রয় নিয়েছেন স্কুলে। কিন্তু এতদিনেও ঘর থেকে নামেনি পানি। এতে তাঁর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। হয়তো জীবনের প্রথম তাকে ঈদ কাটাতে হবে আশ্রয় কেন্দ্রেই, ছিন্নমুল হয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনো সিলেট জেলার ১৩ উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকা ডুবে আছে পানির নিচে। এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন এলাকা। কুশিয়ারা অববাহিকার তীরবর্তী ৬ উপজেলার প্রায় পুরোটাতেই এখনো পানি। এসব এলাকার মানুষ বসবাস করছেন আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। পানি কমতে শুরু করায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন ঈদের আগে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু এখন তাদের সেই আশায়ও গুড়েবালি। সুরমা অববাহিকার সিলেট সদর সহ সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের চিত্রও প্রায় একই।
এসব এলাকার হাজার হাজার কৃষকের ধান গোলায় ভিজে নষ্ট হয়েছে। এ ধানের ওপর যেসব কৃষক পরিবার পুরোপুরি নির্ভরশীল, তারা দিশাহারা।
পাউবো জানায়, সিলেটের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে কমছে। শুক্রবার ভোররাত থেকে সিলেটে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে কিছুটা দেরিতে সূর্যের দেখা মিলেছে। বেলা ১১টার দিকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্যের আভা দেখা গেছে। তবে আধা ঘণ্টার মধ্যে আবার দুই-এক ফোঁটা বৃষ্টি ঝরতে শুরু করে।
সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার তুলনায় শুক্রবার সকাল ৯টায় পানি দশমিক ১২ সেন্টিমিটার কমে ১৩ দশমিক ৩৯ সেন্টিমিটারে অবস্থান করে। নদীর সিলেট পয়েন্টে পানি আগের দিনের তুলনায় দশমিক শূন্য ২ সেন্টিমিটার কমে ১০ দশমিক ৭৬ সেন্টিমিটারে অবস্থান করে।
কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানি দশমিক শূন্য ৭ সেন্টিমিটার কমে ১৬ দশমিক ২৪ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছে। নদীর শেওলা পয়েন্টে পানি দশমিক শূন্য তিন সেন্টিমিটার কমে ১৩ দশমিক ৩৭ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছে। তবে নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। ওই পয়েন্টে পানি অবস্থান করছে ১০ দশমিক ৪৮ সেন্টিমিটারে। নদীর শেরপুর পয়েন্টেও পানি কমেছে।
অন্যদিকে লোভা নদীর লোভা ছড়া পয়েন্টে পানি কমেছে দশমিক শূন্য ৭ সেন্টিমিটার। শুক্রবার সকালে পানি অবস্থান করছে ১৩ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটারে। সারি নদের সারিঘাট পয়েন্টে দশমিক ৪৬ সেন্টিমিটার কমে ১১ দশমিক ১৪ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছে।
ধলাই নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে শুক্রবার সকালে দশমিক ১৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। নদীর ওই পয়েন্টে পানি রয়েছে ১০ দশমিক ৪৬ সেন্টিমিটার।
সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, সিলেটে দুই-এক দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও বন্যার আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া নদ-নদীর পানিগুলো ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কাছে শুক্রবার সকালে সুরমা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ৬৩ সেন্টিমিটার। শেষ ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়েছে ২১ মিলিমিটার। এর আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল ১৮৫ মিলিমিটার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টি হলেই জেলার নদ-নদীর পানি কিছুটা বাড়বে। তবে সেটার পরিমাণ বেশি হবে না। আগের মতো পরিস্থিতি হওয়ার কোনো পূর্বাভাস নেই।
এদিকে, সুনামগঞ্জে এখনো বিভিন্ন উপজেলায় মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটে বন্যার পানি আছে। পানি কিছুটা কমলেও অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না। অনেকের বাড়িঘর বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার চারটি উপজেলার সঙ্গে এখনো সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সোমবার থেকে পানি আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক ও সদর উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এখন আবার পানি নামছে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কাজীর পয়েন্ট, বিলপাড়া, নবীনগর, পশ্চিম নতুনপাড়া এলাকার যেসব স্থানে বৃহস্পতিবার নতুন করে পানি উঠেছিল, রাতে বৃষ্টি না হওয়ায় সেসব স্থান থেকে পানি নেমেছে।