৩০ ডিসেম্বর ২০১৭
অতিথি প্রতিবেদক : সাবেক অর্থমন্ত্রী এএসএম কিবরিয়া হত্যা মামলায় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই নানা ঘটনা আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মুখোমুখি হয়েছে সিটি কর্পোরেশন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এ প্রতিষ্ঠান চলতি ২০১৭ সালে ছিল আলোচনার শীর্ষে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর কারাভোগ ছিল গত তিন বছরের আলোচিত ঘটনার একটি।
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে জামিনে মুক্তি পেলে মেয়র আরিফকে নিয়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা। দীর্ঘ ২৭ মাস কারাভোগের পর ফের সিটি কর্পোরেশনের হাল ধরেন তিনি। তবে আরিফের অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ঘটে যায় নানা ঘটনা। কিছু ঘটনা ঘটে আরিফুল হক পুনঃরায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে। তবে আলোচনার সমাপ্তি ঘটনান নারী কাউন্সিলর শামীমা স্বাধীন। চলতি বছরের শেষ দিকে টকঅবদ্যা টাউন হয়ে যান শামীমা স্বাধীন। তাঁর নির্বাচনী ওয়ার্ডের কাজ নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগে সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে। শামীমা প্রধান প্রকৌশলীকে ঘুষি মেয়ে ঘটনান লঙ্কা কান্ড।
মেয়র আরিফ মুক্ত : ২৭ মাস কারাভোগের পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জামিনে মুক্তি পান আরিফুল হক চৌধুরী। জনতার ভোটে নির্বাচিত হয়ে আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট নগর সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন। এরই মাঝে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় ওঠে আসে তাঁর নাম। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সিনিয়র এএসপি মেহেরুন্নেছা পারুল তৃতীয় দফা সম্পূরক চার্জশিটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র গোলাম কিবরিয়া (জি কে) গউছসহ নতুন আরো ১০ জনের সঙ্গে অভিযুক্ত হিসেবে আরিফুল হক চৌধুরীকেও অন্তর্ভুক্ত করেন।
২০১৪ সালের ২১শে ডিসেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালন সে চার্জশিট গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২৮ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩০ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন আরিফুল হক। তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন আদালতে। শুরু হয় বন্দিজীবন। আদালতে চার্জশিট গৃহীত হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হন আরিফ। কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ই কিবরিয়া হত্যা সংশ্লিষ্ট বিস্ফোরক মামলায়ও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।
১৫ মাস বন্দিজীবন কাটানোর পর মাঝে ১৫ দিন মুক্তির দেখা পার সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফুল হকের নিজের এবং তাঁর মায়ের অসুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে ২০১৬ সালের ২২ মার্চ হাইকোর্ট থেকে ১৫ দিনের জামিন পেয়েছিলেন। পরে ২৮ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায়ই মুক্ত হন আরিফুল হক। জামিনের মেয়াদ শেষে ১১ই এপ্রিল সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে আরিফুল হকের জামিন নামঞ্জুর হয় এবং তাকে আবার কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে বন্দি থাকাবস্থায় নতুন আরো একটি মামলায় নাম আসে আরিফের।
আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় গ্রেনেড হামলা মামলায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বরখাস্ত হওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম সংযুক্ত করতে চান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি হবিগঞ্জ জোনের সহকারী পুলিশ সুপার বসু দত্ত চাকমা। ২০ জুলাই সুনামগঞ্জের (দিরাই) আমলগ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কারাবন্দি এ মেয়রকে গ্রেনেড হামলা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করেন তিনি।
এ মামলায় ২৭ নভেম্বর সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় আরিফুল হককে। সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করে আরিফুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। অবশ্য এরই মাঝে একে একে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেতে থাকেন আরিফ। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন মিললে আরিফের মুক্তির পথ খুলে ।
দায়িত্বে এনামুল হাবীব : আরিফুল হক চৌধুরী কারাগারে যাওয়ার পর প্যানেল মেয়র নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পান সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে তাকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘ ২৭ মাস দায়িত্ব পালন করেন। মেয়রের অনুপস্থিতিতে উন্নয়ন কাজ করলেও কাউন্সিলরদের চেয়ার দখলের মামলায় বার বার তিনি আলোচনায় এসেছেন।
‘বঞ্চিত’ কয়েস লোদী : সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র নিয়ে জটিলতা দূর না হওয়ায় প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে যাওয়ার পর সিসিকের নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্থানীয় মন্ত্রণালয় সাময়িক বরখাস্ত করে। এর পর থেকে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের পদ নিয়ে রশি টানাটানি শুরু করেন প্যানেল মেয়র-১ রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও প্যানেল মেয়র-২ অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ চৌধুরী। সিটি কর্পোরেশন আইন ২০০৯ এর ২০ ধারা অনুযায়ী তাকে এই দায়িত্ব না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা ‘বঞ্চিত’ করছেন বলে অভিযোগ কয়েস লোদীর।
তিন কর্মকর্তার কার্যালয়ে তালা : টেন্ডার নিজেদের আয়ত্তে নিতে না পারায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তার কার্যালয়ে তালা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ পন্থী কাউন্সিলরা। তবে তালা লাগানোর সময় সিসিকের এই কর্মকর্তা কার্যালয়ে ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হলে প্রায় এক সপ্তাহ সিসিকের কার্যক্রম স্খবির ছিল।
তালা দেয়ার সময় ছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা, কাউন্সিলর তৌফিক বক্স লিপন, আজাদুর রহমান আজাদ, আবজাদ হোসেন আমজদা, রফিকুল ইসলাম ঝলক, মুস্তাক আহমদ, মখলিছুর রহমান কামরান, ইলিয়াসুর রহমান ইলিয়াছ।
বাস টার্মিনাল ইজারা নিয়ে নগর ভবন উত্তপ্ত : নগরীর দক্ষিণ সুরমা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ইজারা নিয়ে যুবলীগ ও পরিবহন ম্রমিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে নগর ভবনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইজারা দরপত্র জমা দেয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে। অবশ্য যুবলীগ নেতা কর্মীদের বাধা উপেক্ষা করে পুলিশের সহযোগিতায় দরপত্র জমা দেন শ্রমিক নেতা সেলিম আহমদ ফলিক। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপযাচাই বাছাই শেষে বৈধ দরদাতার নাম ঘোষণা করেন। এ ঘটনার বেশ এখনো কাটেনি। বাস টার্মিনাল নিয়ে যুবলীগ ও পরিবহন শ্রমিকরা এখরো মুখোমুখি।
নূর আজিজকে স্বাধীনের ঘুষি : সর্বশেষ লঙ্কাকান্ড ঘটিয়ে সিসিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন নারী কাউন্সিলর শামীমা স্বাধীন। গত ১৯ ডিসেম্বর এই নারী কাউন্সিলরের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। পরে তাঁকে বরখাস্তের সুপারিশ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে মেয়রের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়।
২০১৩ সালের নির্বাচনে মেয়রের পালাবদলের পর থেকেই সিসিকে শুরু হয় কর্মকর্তা-কাউন্সিলরদের বিরোধ। নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারান্তরীণ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত মেয়র হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও কাউন্সিলর সালেহ আহমদ চৌধুরীর মধ্যে।
আদালত পর্যন্ত গড়ানোর বিরোধের কারণে কেউই পাননি ভারপ্রাপ্ত মেয়রের চেয়ার। তার বদলে এ চেয়ারে বসেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব। সেখান থেকেই শুরু মতবিরোধ ও দূরত্ব। শামীমা স্বাধীনের অভিযোগ ছিল প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে ইঙ্গিত করে অশালীন মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমি ঘুষি মারিনি। উল্টো তিনি আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন।
(আজকের সিলেট/৩০ ডিসেম্বর/ডি/এমকে/ঘ.)