৯ জুন ২০২২


সিলেটে ডুবে যাওয়া নলকূপে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : সাম্প্রতিক বন্যায় ডুবে যাওয়া সুপেয় পানির প্রধান উৎস নলকূপের পানি ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সিলেটে পানি নেমে যাওয়ার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও বিশুদ্ধকরণের উদ্যোগে না থাকায় পান সহ যাবতীয় কাজে সেই পানি ব্যবহারের ফলে দিন দিন বাড়ছে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রেও জানা গেছে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শিশু ও বয়স্ক।

এদিকে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে সিলেট জেলায় ১২ হাজারের বেশী নলকূপ তলিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডুবে যাওয়া নলকূপের সঠিক তথ্য নেই কারো কাছে। সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল শাখায় শুধু অনুমতি নিয়ে স্থাপিত নলকূপের তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ডুবে যাওয়া নলকূপের সঠিক তথ্য নেই সিসিকের কাছে।
এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।

তিনি বলেন, নগরীতে কতটি নলকূপ রয়েছে, কতটি ডুবেছে সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। ব্যক্তি মালিকানাধিন নলকূপ নিজ উদ্যোগেই জীবানুমুক্ত করতে হবে। এখানে সিসিকের কিছু করার নেই।

এদিকে, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপর নলকূপ ও মোটর বিশুদ্ধকরণে করার পর পানি ব্যবহারের কথা থাকলেও এ নিয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি সিসিক। তাদের পক্ষ থেকে নলকূপ বিশুদ্ধকরণ করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ বাসা বাড়ীর মালিক সেই নির্দেশনার কথা জানেন না।

ফলে পানি নেমে যাওয়ার পর নামকাওয়াস্তে মোটর পরিস্কার করে সেই পানি ব্যবহার করছেন অনেকে। অথচ বন্যার পর পানিতে তলিয়ে যাওয়া নলকূপ পরিস্কারের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। সেই পদ্ধতি ছাড়া পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া সহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকগণ।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এরমধ্যে যদি নলকূপ তলিয়ে যায় আর সেটা সঠিক নিয়ম অনুসরণ করে বিশুদ্ধকরণ না হয় তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। আমরা বন্যার সময় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করেছি। কিন্তু নলকূপ বিশুদ্ধকরণের কোন উপাদান আমাদের কাছে নেই। কারণ এ বিষয়টা সিসিকের প্রকৌশল ও পানি শাখা দেখে থাকে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে নলকূপ কীভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে, সেটা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম ও সভা-সমাবেশে উপস্থিত মানুষদের বলে দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়েও এ সচেতনতা চালান। দপ্তরের ফেসবুক পেজেও তা বারবার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যেন কেউ নলকূপ জীবাণুমুক্ত না করে পানি পান না করেন, এ মেসেজটা আমরা বিভিন্নভাবে জানিয়ে দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, সিলেট জেলায় প্রায় আড়াই লক্ষাধিক নলকূপ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরো বেশী হতে পারে। কারণ উপজেলা এলাকায় সরকারীভাবে নলকূপ থাকে হাতেগুনা কয়েকটি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে নলকূপের সংখ্যা অনেক। আমাদের মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে জেলার ১৩ উপজেলায় ১২ থেকে ১৩ হাজার নলকূপ পানিতে তলিয়ে যায়। আমাদের জনশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সকল বাসা বাড়ীতে গিয়ে বিশুদ্ধকরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিশুদ্ধকরণের নিয়মাবলী বলে দিয়েছি। উপজেলা প্রকৌশলীগণও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নলকূপ বিশুদ্ধকরণের পদ্ধতি বলে দিয়েছেন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলী আকবর বলেন, নগরীতে কতটি নলকূপ রয়েছে সেই তথ্য আমাদের হাতে নেই। কারণ নলকূপ স্থাপনের আগে সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি নিতে হয়, কিন্তু অনেকেই সিটি কর্পোরেশনকে না জানিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নলকূপ স্থাপন করেছেন। ফলে এসব নলকূপের তথ্য আর আমাদের হাতে আসেনা। তবে অনুমতি নিয়ে স্থাপিত নলকূপের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এরমধ্যে থেকে কয়টি নলকূপ ডুবেছিল তা অফিসে গিয়ে দেখে বলতে হবে।

বন্যা পরবর্তী সময়ে পানি বিশুদ্ধকরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, অনুমতি নিয়ে স্থাপিত হলেও নলকূপ ব্যক্তি মালিকানাধিন। তাই নলকূপ বিশুদ্ধকরণের বিষয়টিও তাদেরকে নিজ উদ্যোগে দেখতে হবে। এরপরও আমরা স্ব স্ব এলাকার জনপ্রতিনিধিদের বলে দিয়েছি কিভাবে নলকূপ বিশুদ্ধকরণ করতে হবে। কোন এলাকায় কারা বিশুদ্ধকরণ করেছে, কারা করেন নি সেসব তথ্য আমাদের কাছে নেই।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বয়ে যাওয়া বন্যায় সিলেট জেলার অধিকাংশ উপজেলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি দীর্ঘ সময় অর্থাৎ ১২/১৩ দিন থাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। এরমধ্যে অন্যতম ক্ষতি হয়েছে বিশুদ্ধ পানির উৎস নলকূপের। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের জনবল সঙ্কট ও জনপ্রতিনিধিদের নিরবতায় বন্যার পানি নেমে গেলেও এখনো বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষ। দ্রুত নলকূপ জীবানুমুক্ত না করে দীর্ঘদিনব্যাপী এই পানি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন হাজার হাজার মানুষ। শারীরিক রোগপ্রতিরোধ শক্তি থাকায় বর্তমানে পানিবাহিত রোগ থেকে নিরাপদ থাকলেও যাদের রোগপ্রতিরোধ শক্তি দুর্বল রয়েছে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর জানিয়েছে, দূষিত পানি পানের কারণে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তলিয়ে যাওয়া নলকূপ জেগে ওঠার পরপরই জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া উচিত। এটি করতে হলে প্রথমে ১২-১৫ লিটার পানি একটি বালতিতে নিয়ে ২০০-৩০০ গ্রাম পরিমাণ ব্লিচিং পাউডার ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মিশ্রণ ছেঁকে নিতে হবে অথবা মিশ্রণ স্থির হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পরে নলকূপের পাম্পের হাতল ও প্লাঞ্জার রড পাম্প থেকে উঠিয়ে ফেলতে হবে। এরপর মিশ্রণের অর্ধেক পানি পাম্পের ভেতর ঢালতে হবে। পরে হাতল ও প্লাঞ্জার রড ভালোভাবে পরিষ্কার করে ময়লা বা কাদা সরাতে হবে। অতঃপর হাতল ও প্লাঞ্জার রড পুনরায় স্থাপন করে ঘোলা পানি দূর না হওয়া পর্যন্ত পাম্প করতে হবে। পাম্পের সাহায্যে পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার পরপরই অবশিষ্ট মিশ্রণ পাম্পের ভেতর ঢালতে হবে এবং ব্লিচিং পাউডার বা ক্লোরিনের গন্ধ থাকা পর্যন্ত পাম্প করতে হবে।

সবশেষে নলকূপের আশপাশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মোটরচালিত নলকূপও একই নিয়মে বিশুদ্ধকরণ করতে হবে। অন্যথায় অনিরাপদ পানি ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে থাকবে। যারা ইতোমধ্যে পরিষ্কার করে নিয়েছেন ভালো। যারা এখনো নলকূল জীবানুমুক্ত করেননি তাদেরকেও দ্রুত বিশুদ্ধকরণ করতে হবে।

শেয়ার করুন