৩০ মে ২০২২
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : পর্যটনকন্যা সিলেটের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র জাফলং-এ কেবল পর্যটকই নয়; সেখানকার দোকানদারদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়েছে। হোটেল রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে যাত্রীবাহী নৌকা, ট্যুরিস্ট গাইড এমনকি ক্যামেরাম্যানদেরকেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়েছে। আর স্বেচ্ছাসেবকরাই সেখানে চালিয়েছে হরেক রকম চাঁদাবাজি। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি,জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানিয়েছেন, সেখান থেকে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলাল বলেন, জাফলং পর্যটন এলাকায় যারা কাজ করেন; তাদের সবার কাছ থেকেই পর্যটন উন্নয়ন কমিটির নামে ‘ইউএনও’র বাহিনী’ চাঁদা আদায় করেছে। চাঁদাবাজি করা হয় প্রকাশ্যে।তদন্তে চাঁদাবাজির আদ্যোপান্ত বেরিয়ে আসবে।’
তবে, পর্যটকদের বাইরে কোথাও কোনো টাকা তোলা হয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান। তিনি বলেন, পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি বাবদ সর্বমোট প্রায় ৬০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে ১২ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটন কেন্দ্র জাফলং-এ ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা রশিদ দিয়ে ১০ টাকা আদায় করতেন। জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি বাবত ১০ টাকা আদায়ের কথা। কিন্তু, স্বেচ্ছাসেবকরা পর্যটকদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের দোকানদারদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করেছে স্বেচ্ছাসেবক নামের ওই সশস্ত্র বাহিনী। লাঠিসোঁটা নিয়ে দায়িত্ব পালন করার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা অনেকটা ভীত হয়ে পড়তেন। গেল ৪ মে এই বাহিনীর হাতেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হন নারীসহ ৪ পর্যটক। এই ঘটনার পর থেকেই এদের নানা অপকর্ম বেরিয়ে আসতে থাকে। পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি আদায়ের বাইরে গাড়ী পার্কিং এর টাকার নামে আদায় করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
স্থানীয়রা জানান, পর্যটকরা আসার পর পরই তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি প্রবেশ ফি ১০ টাকা করে আদায় করা হতো। পর্যটকদের নিয়ে আসা প্রতিটি গাড়ীর পার্কিংয়ের জন্যে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। পর্যটকরা যে নৌকায় করে জাফলং এর স্বচ্ছ পানি আর অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করতেন; এই নৌকা থেকে আদায় করা হতো ৩০০ টাকা। একদিনের জন্যে নৌকার মাঝিকে গুণতে হয়েছে এই টাকা।
জাফলংয়ে আসা পর্যটকরা ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেখানে দায়িত্বরত ফটোগ্রাফারদের কাছ থেকে জনপ্রতি আদায় করা হতো ১০০ টাকা করে। এখানেই থেমে থাকেনি স্বেচ্ছাসেবকরা; পর্যটন কেন্দ্রে চানাচুর, বাদাম, বরই,আমড়াসহ নানাজাত খাবার পণ্য বিক্রি করে সংসার চালান অনেক ফেরিওয়ালা। প্রতি ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আদায় করা হতো ১০০ টাকা। বেলুন -পুতুলসহ শিশুদের খেলনা সামগ্রী বিক্রেতাদের কাছ থেকে নেয়া হতো প্রতিদিন ১০০ টাকা করে। প্রতিটি কাপড়ের দোকান থেকে দিনে নেয়া হতো ৩০০ টাকা।
এছাড়া, প্রতিটি হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে দিনপ্রতি ৪০০ টাকা করে আদায় করেছে “স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী”।
এভাবে, প্রতিদিন অবৈধ চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে মর্মে স্থানীয় একাধিক সূত্র এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে।
জাফলং পর্যটন কেন্দ্রে আসা পর্যটকদের সুবিধার জন্যে কয়েক বছর আগে বল্লাঘাটে একটি সুরম্য রেস্টুরেন্টসহ সুবিশাল ভবন নির্মাণ করে দেয় সিলেট জেলা পরিষদ।ভবনটিতে একাধিক মানসম্মত ওয়াশরুম, একসাথে কয়েক শ’ লোক বসে খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। ভবনের সামনে রয়েছে বিশাল পার্কিং। চারদিকে দেয়ালঘেরা এ জায়গাটি পর্যটকদের জন্যে বেশ নিরাপদ। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অজুহাতে বল্লাঘাট যাতে পর্যটকরা যেতে না পারেন-এর আগেই গড়ে তোলা হয়েছে বিকল্প জায়গা।
এদিকে, স্বেচ্ছাসেবক নামক লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে পর্যটকরা আহত হওয়ার পর জাফলং পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে পর্যটকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে।
এই বাহিনীর লোকজন প্রবেশ ফি’র বাইরে কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই প্রতিদিন ‘চাঁদাবাজি’ করেছে। তাদের অবৈধ কর্মকান্ডের ফলে ইমেজ সংকটে পড়েছে জাফলং।
টাকাগুলো কোথায়, কার কাছে গিয়েছে-তা খুঁজে বের করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি, সাধারণ লোকজন ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জাফলং এর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পাশাপাশি এই লুটপাটের সাথে সম্পৃক্তদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানানো হয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল বলেন, জাফলং-এ কি পরিমাণ চাঁদাবাজি করা হয়েছে-তা অবর্নণীয়। ছোটো ছোটো দোকান, নৌকা, ছবি তোলার ফটোগ্রাফারসহ পর্যটন এলাকায় যারা কাজ করেন-তাদের সকলের কাছ থেকে পর্যটন উন্নয়ন কমিটির নামে ইউএনও’র বাহিনী চাঁদা আদায় করেছে। ইউএনও’র আস্কারায় স্বেচ্ছাসেবকরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। এর ফলে সিলেটের বাইরে থেকে আসা নিরীহ পর্যটকদের শরীরে হাত তুলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি।এটি ইউএনও’র নিজস্ব বাহিনী। এলাকার যে কাউকে এই বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে। জাফলং থেকে এপর্যন্ত কতটাকা তোলা হয়েছে-তা কেউ জানে না। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে আমরাও জানি না; কি পরিমাণ অর্থ তোলা হল আর উত্তোলিত অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ করা হল-এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান সিলেটের ডাককে বলেন, জাফলং পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি বাবদ সর্বমোট প্রায় ৬০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পর্যটন কেন্দ্রে ৪টি কাউন্টার বসানো হয়। পুলিশ ও ভলান্টিয়ার বসার জন্যে দু’টি জায়গায় ছাউনি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু বেঞ্চ বসানো হয়। ভেতরে ড্রেস পরিবর্তনের রুম তৈরি করা হয়েছে। টিকেট ছাপানোর টাকাও এখান থেকেই গিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য্য বর্ধন করতে গাছ কিনে টবে বসানো হয়েছে। বাকী টাকা যাদেরকে ভলান্টিয়ারদের হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে-তাদেরকে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ৪১ লাখ টাকার মতো ব্যাংক একাউন্টে জমা রয়েছে।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্যে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো ফান্ড নেই। কোনো না কোনো ফান্ড জেনারেট করতে হবে। এ জন্যেই ১০ টাকা করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। ভলান্টিয়ারদের যে টাকা দেয়া হবে; এর বাইরে যে টাকা থাকবে তা দিয়ে এখানে উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হবে। ১০ টাকার বাইরে কোনো টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না। জাফলং পর্যটন এলাকায় অন্য যারা আছেন; তাদের সাথে আর্থিক বিষয়ে কিছুই হয়নি। শুধুমাত্র পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি বাবত ১০ টাকা আদায় করা হয়েছে। তাও গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুরের লোকজন ১০ টাকার বাইরে ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর সিলেট জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি জাফলং পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি বাবত ১০ টাকা করে আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এই টাকা আদায় করা হতো। গেল ৪ মে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কর্তৃক পর্যটকদের উপর অতর্কিত হামলার পর থেকে ওই টাকা আদায় সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
তবে,পর্যটন মন্ত্রণালয় জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটিকে এই টাকা আদায়ের কোনো নির্দেশনা বা অনুমোদন দেয়নি বলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পর্যটন-২) শ্যামলী নবী নিশ্চিত করেছেন।