১৪ মে ২০২২
ডেস্ক রিপোর্ট : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির ফলে সিলেট বিভাগের নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। সিলেটের প্রধান নদী সুরমায় পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়ে পড়েছে সিলেটের গোয়ানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ আর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজারসহ বেশ কিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল। এসব এলাকায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টি ও ঢলে প্লাবিত হয়ে পড়েছে সিলেটের পাঁচ উপজেলার নিম্নাঞ্চল। এরই মধ্যে সুরমা নদীর পানি দুটি পয়েন্টে বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৃষ্টিতে সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। পানিতে তলিয়ে গেছে নগরের বিভিন্ন সড়ক। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট কার্যালয়ের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলয় পাশা জানান, শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সুরমার পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলসিদেতেও বিপদদসীমার ওপরে বইছে। এ ছাড়া সারি ও গোয়াইন নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, সিলেটে ১৮ মে পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে রাতের বেলা বৃষ্টি বেশি হবে। তিনি বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ১২৮ মিলিমিটার ও শনিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানান, সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির সঙ্গে যোগ হয়েছে উজান থেকে নেমে আসা ঢল। ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা ও আসাম প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঢল ও বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট এলাকার নিম্নাঞ্চল। এই তিন উপজেলায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট এবং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব গ্রামের সঙ্গে উপজেলা সদরের সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। এ উপজেলায় ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে। একই অবস্থা গোয়াইনঘাটেও।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, সিলেটের পানিবন্দি মানুষের জন্য ৭৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলায় এসব চাল বিতরণ করা হবে। তিন জানান, এসব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জে সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সুরমা, যাদুকাটা, রক্তি, বৌলাই কুশিয়ারা পাটলাইসহ সকল নদ-নদীর পানি বেড়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতেও ভাটির উপজেলা তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশার পানি বেড়েছে অনেক। হাওর এলাকার নদ-নদীতে মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে হু হু করে।
তাহিরপুর উপজেলার রতনশ্রী, গোলাবাড়ি, মান্দিয়াতা, জয়পুরসহ টাংগুয়া ও মাটিয়ান হাওর তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে গ্রামের ছোট ছোট খালগুলো পরিপূর্ণ। ঢলের পানিতে ভেসে আসা পলির কারণে হাওরের পানির রঙও বদলেছে। পানিশূন্য হাওরগুলোতে বিভিন্ন স্লুইসগেট রেগুলেটর ও বাঁধের ফাঁক-ফোকর দিয়েও পানি প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
মান্দিয়াতা গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, এখন হাওরে পানি ঢুকলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। হাওরে কোনও ফসল নেই। তাই ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে বৃষ্টির কারণে ধান-চাল শুকাতে সমস্যা হচ্ছে।
বালিজুড়ি গ্রামের কৃষকরা জানান, আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে তাদের বাদাম ক্ষেত তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি সরে গেলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হবে না।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর রাবারড্যাম উপচে খরচার হাওরের উঁচু জমিতে পানি প্রবেশ করছে।
দোয়ারাবাজারে টানা বৃষ্টিপাত ও মেঘালয় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও লোকালয়সহ বিভিন্ন রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ৪ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বোরো ধান।
আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে কৃষকদের স্বপ্নের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা ভর করেছে তাদের মাথায়। উপজেলার অর্থনৈতিক অবস্থা আগের মতো না হওয়ায় অনেকেই ধার-দেনা করে রোপণ করেছিলেন বোরো ধানের বীজ। এমন সময় ধান ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের চেলানদীতে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বেড়ে গিয়ে নদীর নিকটবর্তী এলাকায় তীব্র ভাঙ্গনের দেখা দিয়েছে।
সীমান্তবর্তী বাংলাবাজার, লক্ষীপুর, বগুলা, নরসিংপুর, সুরমা, দোহালিয়া, পান্ডারগাঁও, মান্নারগাঁও ও দোয়ারা সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন রাস্তা, মাঠঘাট, আউশ জমিতেও পানি ঢুকছে।
মাঠ ও গোচারণ ভূমিতে পানি উঠায় গো-খাদ্য সংকটের শঙ্কায় আছেন মৎস্য খামারিরা। গত বছরেই চার দফা বন্যায় ভেসে গিয়েছিল এখানকার শতাধিক খামারের কোটি টাকার মাছ ও রেনু।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাংশু কুমার সিংহ বলেন, পানি বাড়লেও কোথাও ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও পাওয়া যায়নি। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রশাসনিক তৎপরতা থাকবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বিমল চন্দ্র সোম বলেন, সদর বিশ্বম্ভরপুর দোয়ারাবাজার উপজেলার কিছু জমিতে পানি প্রবেশের খবর পেয়েছি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহরুল ইসলাম জানান, উজানে বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।