১৬ ডিসেম্বর ২০১৭


ওসমানীনগরে বেড়েছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই

শেয়ার করুন

ওসমানীনগর প্রতিনিধি : ওসমানীনগরে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ঘটছে একের পর এক চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই। সর্বশেষ গত বুধবার গভীর রাতে আবারও দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের জায়ফরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূর গজনবীর বাড়িতে এ ডাকাতির ঘটনাটি ঘটে। ডাকাতরা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, মূল্যবান সামগ্রীসহ ১২ লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। মৃত আব্দুন নূর গজনবীর ছেলে বদরুল ইসলাম গজনবী জানান, বুধবার দিনগত রাত তিনটার দিকে ১৪/১৫ জনের মুখোশপরা ডাকাত দল তাদের বসত ঘরের প্রধান ফটকের স্টিলের গেইটের তালা ও দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে। ডাকাত দল অস্ত্রের মুখে ঘরের সকলকে জিম্মি করে হাত পা বেঁধে ২২ ভরি স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল সেটসহ প্রায় ১২ লক্ষ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ওসমানীনগর সার্কেল) মো. সাইফুল ইসলাম, ওসমানীনগর থানার ওসি মোহাম্মদ সহিদ উল্যা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি।

এছাড়া গত ৩ মাসে এ উপজেলায় একাধিক ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাই জনমনে আতংক ছড়িয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ১১টি ঘটনা ঘটে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্যস্ততম এলাকা ঘিরে। সরকারী বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে সংঘটিত এসব কর্মকান্ডে জড়িতদের এখন পর্যন্ত সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। মালামাল উদ্ধারেও কোন অগ্রগতি নেই।

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর রাতে উপজেলার দয়ামীর ইউপি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি হয়। পেছনের গেইটের তালা ভেঙ্গে কেন্দ্রে প্রবেশ করে চোরের দল সিলিং ফ্যান, আয়রণ কড ও ধাতব তৈরী রোগীর সিট, পানির মটর (পাম্প), লোহার সেট গ্লীন ও জরুরী কাগজপত্রসহ লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে যায়। থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি নেই।

২০ নভেম্বর রাতে তাজপুর ইউপির বরায়া মোল্লাপাড়া গ্রামের দবির মিয়ার বসত ঘরে গেইটের তালা ভেঙ্গে ডাকাতরা প্রবেশ করে। গৃহকর্তা হাত পা বেঁধে পরিবারের লোজনদের আগ্নেয়াস্ত্রেয় ভয় দেখিয়ে স্বর্ণা অলংকার, নগদ টাকাসহ কয়েক লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে যায়।

১৮ নভেম্বর শনিবার রাতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কুরুয়া এলাকায় প্রাণ কোম্পানির গাড়ি আটকে চালক ইমরুল ইসলামকে ছুরিকাহত করে করে একদল দুর্বৃত্ত। মুমূর্ষ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অনেকেরই ধারণা তার কাছ থেকে কোম্পানীর টাকা নিতেই এ হামলা।

১৮ নভেম্বর রাতে উপজেলার সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সংলগ্ন সিলমানপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ চুরির ঘটনাটি ঘটেছে। চোরের দল বিদ্যালয়ের দরজা ভেঙ্গে প্রায় ৫০ জোড়া স্টিলের ডেস্ক, ব্রেঞ্চ, সীমানা প্রাচীরর গেইট বিদ্যালয়ের মূলবান জিনিসপত্র সহ প্রায় ২ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে। কাউকে আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

৭ নভেম্বর রাতে সাদীপুর ইউনিয়নের কাগজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০ম বারের মতো চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা বিদ্যালয়ে দেয়াল থেকে খুলে স্টিলের দরজা ও অফিসকক্ষের একটি আলমিরা নিয়ে যায়। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লক্ষ্মী রায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে আটক করে। ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় গোয়ালাবাজর-ইলাশপুর সড়কের ইটভাটা এলাকায় মুখোশধারী ৩ জন এক মোটর সাইকেল আরোহীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাথে ১৭ হাজার টাকা ও মোবাইল সেট ছিনিয়ে নেয়। তবে পুলিশী হয়রানী এড়াতে এ বিষয়ে থানায় কোন অভিযোগ দেওয়া হয়নি।

১৫ অক্টোবর ওসমানীনগরের তেরহাতি গ্রামে অঞ্জন দাশের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। চোরেরা তার বসত ঘরের ভেন্টিল ভেঙে চুরেরা ঘরে প্রবেশ করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল সেট নিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও আসামীরা এখনও অজ্ঞাত।

৩০ অক্টোবর দুপুরে ওসমানীনগরে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে যাত্রীবাহী বাস আটকে শানুর মিয়া (৩০) নামের এক সৌদি প্রবাসীর ৩৭ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। প্রবাসী উপজেলার উছমানপুর ইউপির ইছামতি গ্রামের আব্দুল হকের প্রবাসী পুত্র শানুর মিয়া গোয়ালাবাজারের একটি ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে একটি লোকাল বাসে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় প্রাইভেট কার থেকে দুইজন অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারী নেমে বাসে ওঠে ডিবি পরিচয় দিয়ে শানুর মিয়াকে প্রাইভেটকারে তুলে সিলেট শহরের দিকে নিয়ে যায়।

পথিমধ্যে শানুর মিয়াকে মারধর করে তার নিকট থাকা ৩৭ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে শানুর মিয়াকে তেলীবাজার বাইপাস রোডে প্রাইভেট কার থেকে ফেলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রবাসী বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করলেও আসামীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউপির গ্রামতলা রোডের শাহজাহান মিয়ার বাসাতে চুরি সংগঠিত হয়। চোরেরা বাসার কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙ্গে বাসায় প্রবেশ করে এবং শয়ন কক্ষের তালা ভেঙ্গে ১৬ ভরি স্বর্ণালংকার, মুল্যবান কাগজপত্র, বাসার দলিলসহ প্রায় ৮ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।

২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ওসমানীনগরে সাংবাদিক জুবেল আহমদ সেকেলের বাড়ীতে চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা ঘরে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ণ, ডায়মন্ডের অলংকার, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে যায়। ঘটনাটি উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউপির দাশপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। জুবেল আহমদ সেকেল থানায় অভিযোগ দিলেও এখনো আসামী চিহ্নিত হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে ওসমানীনগরে বিকাশ পরিবেশকের ৫ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। বিকাশ কর্মী তমাল সোম একটি সিএনজিযোগে গোয়ালাবাজারে থেকে শেরপুরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় একটি মোটর সাইকেলে তিন ব্যক্তি তার সিএনজির গতিরোধ করে। এক পর্যায়ে তার সাথে থাকা ব্যাগ ভর্তি ৫ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। টাকা উদ্ধারে পুলিশী তৎপরতা নেই।

৮ সেপ্টেম্বর ওসমানীনগরের কাগজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চুরি সংগঠিত হয়। চোরেরা বিদ্যালয়ের দরজা ভেঙে বিদ্যালয়ে অফিস ও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে আসববাবপত্রসহ কয়েক লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে যায়। আসামী অজ্ঞাত।

উল্লেখ্য, চুরি হওয়া সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবস্থান ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্যস্থতম এলাকাগুলো। একাধিকবার এসব প্রতিষ্ঠানের মালামাল খোয়া গেলেও পুলিশের ভুমিকা জোরালো নয় বলেই মনে করছেন একাধিক সচেতন ব্যক্তি। তারা বলেন, এলাকায় রাতের বেলা পুলিশি টহল থাকলেও চোরেরা ঠিকই তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে। যা উদ্বেগ গজনক।

ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহিদ উল্যা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির সত্যতা স্বীকার করে সাংবাদিকদের জানান, কয়েকটি অনাকাংখিত ঘটনায় ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। কিছুর তথ্যও পাওয়া গেছে। আশা করছি কিছু দিনের মধ্যেই এলাকার অপরাধীদের চিহ্নিত করে আটকে সক্ষম হবো।

(আজকের সিলেট/১৬ ডিসেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন