৩ মার্চ ২০২২
আহমাদ সেলিম (অতিথি প্রতিবেদক) : চারতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন। যে ভবনের ভেতর কেবল বই আর বই। থাকে থাকে রয়েছে নতুন-পুরাতন বইয়ের শ্রেণিবিন্যাস। শুধু বই নয়, আছে ইংরেজি শেখারও সুযোগ। ফ্রি ব্যবহার করা যাবে ইন্টারনেট। প্রতিটি টেবিলের উপর আছে জাতীয় এবং আঞ্চলিক সংবাদপত্র। যুগের সাথে চলার সবকিছু থাকা সিলেট বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারটি ভুগছে জনবল সংকটে। ২৩ জনের জায়গায় বর্তমানে সাতজন দিয়ে চলছে চারতলা বিশিষ্ট বিশাল গণগ্রন্থাগারটি। পাঠকশূন্যতা থাকলেও করোনার বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পর ক্রমশ বইপড়া মানুষ গ্রন্থাগারটিতে বই পড়তে আসছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, লোকবল সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে ৩ জনের কাজ করতে হচ্ছে। পুরো ভবনে ২৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন সাতজন দিয়ে কোনভাবেই পাঠকদের সুচারু সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ইচ্ছে থাকলেও পাঠক বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্রমতে, এক সময় এই গণগ্রন্থাগারগুলো বাংলাদেশ পরিষদ নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৮২ সালে এসে সেগুলো পাবলিক লাইব্রেরিতে রূপান্তর হয়। শুরুতে প্রান্তিক চত্বরের পাশে টিনের তৈরী একচালা ছিলো এই গণগ্রন্থাগার। পরবর্তীতে সেটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। ২০০৫ সাল থেকে আধুনিকরূপে যাত্রা শুরু করে সিলেট সরকারি বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার। সুন্দর চেয়ার আর টাইলস শোভা পাচ্ছে সবগুলো কক্ষে। থাকে থাকে সাজানো দেশ-বিদেশের দুর্লভ গ্রন্থ, যেন বইসমুদ্র। দুতলায় আছে বিজ্ঞান ও রেফারেন্স পাঠকক্ষ। তৃতীয়তলায় সাধারণ পাঠকক্ষ। আরেকটি কক্ষ নিয়ে রয়েছে শিশু-কিশোর পাঠকক্ষ। চারতলায় রয়েছে বইয়ের গোডাউন। সবমিলিয়ে মোট ৮৫,৯০৭টি বই রয়েছে নিচ থেকে উপরের সবগুলো কক্ষে।
শুধু বই নয়, পুরো পরিবেশও জ্ঞান আহরণবান্ধব। চকচক করছে কাঠের চেয়ার- টেবিল আর টাইলস করা মেঝে। সব সুযোগ-সুবিধা ও আধুনিকতার ছোঁয়া থাকা বিশাল গ্রন্থাগারের তুলনায় পাঠক খুবই নগণ্য। করোনা বাস্তবতায় মানুষ কম হলেও বিধিনিষেধ তোলার পর পাঠক ফেরাতে নেই কোনো বিশেষ উদ্যোগও।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রিকাবীবাজার স্টেডিয়াম সংলগ্ন মার্কেটের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিলেট বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারটি। নিচ থেকে সুন্দর ভবন দেখার পর যে কেউ আগ্রহ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে। সিঁড়ি বেয়ে দুতলায় উঠেই চোখে পড়বে বিজ্ঞান ও রেফারেন্স পাঠকক্ষ। বড় পরিসরে খোলামেলা কক্ষটি। পুরো কক্ষ সাজানো-গোছানো। চকচকে কাঠের চেয়ার-টেবিল, মেঝে পুরোটা টাইলস করা। উপরে চলছে ফ্যান। সুন্দর তাকগুলোকে রাশি রাশি বই। দেশী-বিদেশী বইয়ের সারি। কিন্তু পাঠক নেই আশানুরূপ। দশ থেকে বারো জন পাঠক একনিষ্টে পড়ছেন বই। সবার মনোযোগ বইয়ের দিকে। কেউ পড়ছেন, কেউবা নোট করছেন। তৃতীয়তলার সাধারণ পাঠকক্ষে অবশ্য পাঠক ছিলো বিশ থেকে পঁচিশজন। সেখানেও সুনসান নিরবতা। তরুণ বয়সী পাঠকদের মনোনিবেশ বইয়ের দিকে। অনেকে পড়ছেন সংবাদপত্র।
বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজি শেখার সুযোগ। বৃটিশ কাউন্সিল এই সুযোগটি করে দেয়। শুরুর দিকে সেটি খুবই প্রশংসা পায়। বর্তমানে চলছে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আছে ইন্টাননেট ব্যবহারের সুবিধা। ২০০৯ সাল থেকে রবি সেটি চালু করে। আরো আছে পুরুষ এবং নারীদের পৃথক নামাজের ব্যবস্থা।
প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান-কাম উপ-পরিচালক দিলীপ কুমার সাহা জানান, ২০০৫ সাল থেকে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এই পাঠাগারে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, শিশুতোষ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, ইতিহাস, ধর্ম, সংগীত, শরীরচর্চা, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূগোল ও দর্শনসহ ৮৫,৯০৭টি বই সাজানো রয়েছে। এছাড়াও প্রতিদিনের সংবাদপত্রও সেখানে থাকে। ছোটদের জন্য দু’তলায় রয়েছে শিশু-কিশোর পাঠচক্র। সেখানে শিশু উপযোগী সবধরণের বই আছে। আরো রয়েছে শেখ রাসেল ও বঙ্গবন্ধু কর্ণার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম ও তাহসান সাইকেল নিয়ে এসেছেন গণগ্রন্থাগারে। আলাপকালে তারা জানান, বৃটিশ কাউন্সিল ইংরেজি শিখার সুযোগ তৈরী করে দিলেও সেখানে কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়না। ফলে মানুষ সেবা পাচ্ছেনা।
গ্রন্থাগারটি সাপ্তাহিক বন্ধ রাখা হয় বৃহস্পতি ও শুক্রবার। শনিবার থেকে বুধবার সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সবার জন্য দরজা খুলে রাখা হয়।
এ প্রসঙ্গে কথা হলে ড. সাদিকুর রহমান বলেন, এখন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে প্রজন্ম। বইমুখী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া তাদেরকে ফেরানো সম্ভব নয়।