২৬ ডিসেম্বর ২০২১


আশ্রয়ন প্রকল্পে বিত্তশালী, বঞ্চিত ভূমিহীন

শেয়ার করুন

ওসমানীনগর প্রতিনিধি : ওসমানীনগরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারকে বঞ্চিত ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিত্তশালী একটি পরিবারকে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন আছিয়া বেগম ৪ জনকে অভিযুক্ত করে গত ১০ অক্টোবর আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযুক্তরা হচ্ছেন- আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া, ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা অনিল সিংহ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত হাসুরা বেগমের ২ ছেলে নুর মোহাম্মদ ও নুর জামান।

মামলা সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নে বাংলাবাজার এলাকায় সম্মানপুর মৌজার ৮৩৫ দাগের সরকারি খাস ভূমিতে ৩টি ঘর নির্মাণ করা হয়। উক্ত ভূমিতে বিগত ২২ বছর ধরে মোছা. আছিয়া বেগম পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। আছিয়া বেগমের স্বামী রিকশা চালক রুবেল মিয়া সাদিপুর ইউনিয়ন কর্তৃক ভূমিহীন সনদপ্রাপ্ত। গত ২ এপ্রিল ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা অনিল সিংহ, আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়াসহ কয়েকজন আছিয়া বেগমকে জানান উক্ত ভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩টি ঘর নির্মাণ হবে। এরমধ্যে একটি ঘর আছিয়া বেগমকে দেয়া হবে। এমন প্রতিশ্রুতে তাকে জমি খালি করে দিতে বলেন। এরপর আছিয়া বেগম সরকারি ভূমি ছেড়ে দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে জোড়াতালি দিয়ে ঘর বানিয়ে স্বামী সন্তানকে নিয়ে বাস করছেন।

ঘর নির্মাণের জন্য খরচ বাবদ আছিয়া বেগমের কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। গত ১১ জুন আছিয়া বেগম উক্ত টাকা আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত নুর মোহাম্মদ ও নুর জামানের হাতে তুলে দেন। আগস্টের শেষ দিকে ঘর নির্মাণ শেষ হলে একটি ঘর আছিয়া বেগমকে মৌখিকভাবে সমঝে দেয়া হয়। গত ১ অক্টোবর বিকেলে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন অভিযুক্তরা। আছিয়া বেগম টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে স্বামী-সন্তানসহ আছিয়া বেগমকে মারপিট করে জোরপূর্বক ঘর থেকে বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত নুর মোহাম্মদ এবং নুর জামানের মা হাসুরা বেগম ভূমিহীন না হয়েও ১ ও ২নং অভিযুক্তের সহায়তায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্ধ পেয়েছেন।

অভিযোগকারী আছিয়া বেগম বলেন, আমরা দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এ ভূমিতে ঘর বানিয়ে বাস করছি। বসত বাড়ির ইউপি ট্যাক্স প্রদান করছি। আমার স্বামীর নামে ভূমিহীন সনদ রয়েছে। নিজস্ব বৈদ্যুতিক মিটারও রয়েছে। আমাদের উক্ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ৩টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। নিজেদের বাড়ি রয়েছে এমন পরিবারের ২ জনের জন্য ২টি ঘর বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আহবাব মিয়া গংদের চাহিদা মাফিক টাকা দিতে না পারায় আমি কোন ঘর পাইনি। আমরা মানবেতর জীবন-যাপন করছি।

অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা আহবাব মিয়া বলেন, আমি জনপ্রতিনিধি নই। ঘর বরাদ্দের ব্যাপারে কোথাও আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। আছিয়া বেগম উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে আমার নামে অভিযোগ দিয়েছেন।

নিজের নামে কোন ভূমি নেই দাবি করে হাসুরা বেগম আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দের দলিল দেখিয়ে জানান, তার ছেলে নূর মোহাম্মদ পরিবার থেকে আলাদা। তাই নুর মোহাম্মদের নামে আলাদা ঘর দেয়া হয়েছে। তার (হাসুরা বেগমের) মালিকানায় ভূমির দলিল রয়েছে জানালে তিনি বলেন-এসব মিথ্যা।

হাসুরা বেগমকে ভূমিহীন সনদ প্রদান প্রসঙ্গে স্থানীয় ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের মহিলা ইউপি সদস্য আলেয়া বেগম বলেন, আমি মহিলা হয়ে সব জায়গায় যাওয়া বা সবকিছু ভালো করে যাচাই করা সম্ভব নয়। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার শনাক্তের ভিত্তিতে আমি হাসুরা বেগমকে ভূমিহীন সনদ দিয়েছি। পরবর্তীতে জেনেছি হাসুরার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে।

ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা অনিল সিংহ বলেন, ভূমিহীন সনদ পেয়েই হাসুরা বেগমের নামে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। ঘর ৩টি, দাবিদার ৪ জন। তাই যারা আগে যোগাযোগ করেছে তারা ঘর বরাদ্দ পেয়েছে। আছিয়া বেগমের জন্য অন্যত্র ঘরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন আহমদ বলেন, আছিয়া বেগমের ঘর না পাওয়ার বিষয়টি অমানবিক। এতে জননেত্রী শেখ হাসিনার মহৎ উদ্যোগটি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইউএনও মহোদয়সহ সংশ্লিষ্টদের সাথে একাধিকবার কথা হয়েছে। হাসুরা বেগমের বিষয়ে তিনি বলেন, ওই মহিলা ভূয়া হলফনামা দিয়ে ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা রায়হানা বলেন, এটি আমার যোগদানের পূর্বের ঘটনা। তাই সব স্পষ্ট বলতে পারবো না। তবে আমি আছিয়া বেগমের বিষয়টি জেনে তার জন্য ঘর বানিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছি। আর হাসুরা বেগমের যদি নিজস্ব বাড়ি থেকে থাকে তবে তিনি কিভাবে ঘর পেলেন বা কোন প্রকার দুর্নীতি রয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন