৭ নভেম্বর ২০২১
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কর্মকর্তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় গেজেটভুক্ত প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের জমি বেহাত হয়েছে। আদালতে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চললেও কাগজপত্র উপস্থাপন করেননি ‘সওজ’ কর্মকর্তারা। ফলে, সরকারি ভূমি রক্ষায় তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে ভূমিখেকোরা এ জমি ভোগদখল করছে। পরিকল্পিতভাবেই কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করছেন না ‘সওজ’ কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ বাজারস্থ পূর্ব রামপুর মৌজার জেএল নম্বর ২৪৬, খতিয়ান নম্বর ৯ এর দাগ নম্বর ২৯-এ ৫৭ শতক জমি ১৯৬২ সালে গেজেটভুক্ত। ১৯৫৬-৫৭ এর এলএ মোকদ্দমা ২৩ অনুযায়ী, এই ৫৭ শতক জমির মধ্যে ৩৬ শতক জমি সওজের পক্ষে অধিগ্রহণ হয়; যা ১৯৬২ সালে গেজেটভুক্ত। কিন্তু, জনৈক ওয়াহাব ও আব্দুল লতিফগণ ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা তৈরি করেন। একই বছর তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সরকারি জমিতে তৈরি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পরে, আব্দুল লতিফগণ আদালতে স্বত্ব মামলা দায়ের করেন; যার নম্বর-১৩/১৯৯২। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মামলাটি আদালতে চলমান ছিলো। এই ২২ বছরে কোনো নথিও উপস্থাপন করেনি ‘সওজ’। এরপর ১৫ জুলাই ২০১৪ তারিখে রায় ঘোষণা করেন আদালত। পরে, আপিল করেও আদালতে কোনো দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন না করে সময়ক্ষেপন করে চলেছে ‘সওজ’। এভাবে চলতে থাকলে দখলদার ওয়াহাব-লতিফদের পক্ষে রায় চলে যাওয়াই স্বাভাবিক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোকদ্দমা মামলা দায়ের করা জনৈক আব্দুল লতিফগণ ৮টি দলিল তৈরি করে এই জমি নিজেদের দাবি করেন। যার মধ্যে ৬টি দলিল ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে, একটি দলিল একই বছরের আগস্ট এবং অপরটি সেপ্টেম্বরে তৈরি করা। একই মাসে ৬টি দলিল তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান।
আদালতে তাদের উপস্থাপন করা দলিলগুলো হলো- ১৭৫৩৫ (১৭/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৫৯৫ (১৭/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৫৮১ (১৭/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৫৯০ (১৭/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৪৯২ (১৫/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৪৫৫ (১৩/১২/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ), ১৭৫৩২ (১৯/০৮/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ) এবং ১৪৬৮০ (২৬/০৯/১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ)।
১৯৯২ সালে ভূমি অফিস কর্তৃক তৈরি শামিল ফর্সাতেও ৩৬ শতক জমি সড়ক ও জনপথের বলে উল্লেখ করা হয়।ওই বছরের ৩০ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক ছাতক থানা নির্বাহী অফিসারকে ইস্যু করা এক পত্রে উল্লেখ করেন, ‘ছাতক থানাধীন গোবিন্দগঞ্জ বাজারে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সম্মুখ রাস্তায় জনৈক হাজী আব্দুল লতিফ ও ওয়াহাব আলী ঘর তুলে ব্যাংকের যাতায়াতের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন। অবৈধভাবে নির্মিত দোকান ঘরের জমি অত্র অফিসের সার্ভেয়ার ও সওজ বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে জরিপ করে সওজ বিভাগের জমি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতএব, সওজ বিভাগের জমি থেকে উক্ত অবৈধ দোকান ঘর উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হলো। এ ব্যাপারে থানা ম্যাজিস্ট্রেট ছাতককে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার নিমিত্তে নির্দেশ দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এর আগে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. নজিবুর রহমান মোল্লা জরিপ কাজ সম্পাদন করেন। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন থানা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামসুল আরেফিন সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে (ছাতক) ৮ সেপ্টেম্বর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেন। একই বছর আদালতে স্বত্ব মামলা দায়ের করেন জনৈক ওয়াহাব ও আব্দুল লতিফরা। এরপর থেকে মামলা চলে ২০১৪ সাল পর্যন্ত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সরকার পক্ষে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামলা পরিচালনা করেন। ২০১৪ সালে রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত বারবার সময় চাওয়া হয়। কিন্তু, এর পক্ষে একটি কাগজও উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে রায় সওজের বিপক্ষে যায়। পরে, আপীল করা হলেও একইভাবে সওজ কর্মকর্তারা জমির দলিলপত্র উপস্থাপনের পরিবর্তে সময়ক্ষেপন করেন। যে কারণে এটি খারিজ হয়ে যায়।
জানা গেছে, জমির দলিল সংগ্রহের জন্য কোনো ধরনের চেষ্টাও করেননি সওজ কর্মকর্তারা। এমনকি, ১৯৬২ সালের গেজেটটিও সিলেট সওজের এক কর্মকর্তা ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে তাদের কাছে পাঠালেও তারা এটি আদালতে উপস্থাপন করেনি। অন্যদিকে, ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, সুনামগঞ্জ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত বরাবরে এলএ মামলা নম্বর-২৩/১৯৫৬-৫৭ এর নথি প্রেরণ প্রসঙ্গে চিঠি ইস্যু করেন।
এতে তিনি উল্লেখ করেন, বর্ণিত এল,এ মামলা নং- ২৩/১৯৫৬-৫৭ এর নথি বিজ্ঞ মুন্সেফ আদালত, সুনামগঞ্জ-এ ৪৯/৮৬ স্বত্ত¡ মামলা নিষ্পত্তির স্বার্থে নথিটি আরএম শাখার মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হয়। অদ্যবধ্যি নথিটি ফেরৎ পাওয়া যায়নি। ইহা মহোদয়ের সদয় অবগতির জন্য জানানো হল।
এর দ্বারা প্রমাণ হয়, ২৩/১৯৫৬-৫৭ নথিটি আদালতের কোনো এক শাখায় রয়েছে। তা সত্তেও, সওজ কেন দলীল সংগ্রহ করে উপস্থাপন করতে পারেনি তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একই গেজেটভুক্ত ২৯ নম্বর দাগে জনৈক মো. জহির উদ্দিনের ১২ শতক জমি রয়েছে। এই জমি দেখাশোনা করেন তার ভাই মো. আরশাদ আলী। তিনি অভিযোগ করছেন, সওজ উক্ত ভূমি রক্ষায় আন্তরিক নয়। বরং, তাদেরই যোগসাজশে জনৈক ব্যক্তিরা সরকারি সম্পত্তি ভোগ করছেন। আদালতেও তারা ইচ্ছে করেই কাগজপত্র উপস্থাপন করেননি।
এমনকি তিনি ভাইয়ের পক্ষে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ২৪৬ নম্বর জেএল নামজারী পর্চার খতিয়ান প্রতিস্থাপনের জন্য আবেদন দিলেও তা দিতে অপারগতা জানানো হয়। আরশাদ আলী তার আবেদনে ‘২৪৬ নম্বর জেএলস্থ পূর্ব রামপুর মৌজার ৯ নম্বর খতিয়ানের ২৯ নম্বর দাগের দশমিক ৫৭ একর হতে এলএ মোকদ্দমা নম্বর ২৩/৫৬-৫৭ মূলে কত শতক ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে এবং একই দাগের অবশিষ্ট ভূমির মালিকানা কার কার নামে কত শতক করে রেকর্ডভুক্ত তা জানতে চান।
এর জবাবে ৭ জুলাই ছাতক ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার তাপস শীল সাক্ষরিত পত্রে জানানো হয়, ‘২৪৬ নম্বর জেএলস্থ নথি ছাতক উপজেলা ভূমি অফিস ও সংশ্লিষ্ট জাহিদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ছেঁড়া থাকায় তথ্য প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।’
পরে, আরশাদ আলী ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট ছাতক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে আবারও চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মালিকগণের মালিকানা প্রমাণের দালীলিক তথ্যপত্র নামজারী পর্চার ২৪৬ নম্বর জেএল ৯ নম্বর মূল খতিয়ানে লিপিবদ্ধ ছিল। ইহা ছেঁড়া থাকায় জরুরিভিত্তিতে প্রতিস্থাপন করা আবশ্যক।’
আবদনের সঙ্গে তিনি নামজারী পর্চার জাবেদা নকলের ফটোকপি, এলএ মোকদ্দমার প্রকাশিত গেজেটের ফটোকপি, এলএ নকশার ফটোকপি এবং এসএ পর্চার ফটোকপি সংযুক্ত করেন।
তবে সুনামগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই।