১৭ অক্টোবর ২০২১


ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে কেন এত দ্বন্ধ ?

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : দীর্ঘ প্রায় ৪বছর ঘোষণা করা হয়েছে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি। কমিটি ঘোষণার পর পরই নব গঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দকে নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। এনিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গন। শুধু উত্তপ্তই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ উৎকন্ঠাও। দীর্ঘদিন কমিটিহীন সিলেট ছাত্রলীগ নতুন কমিটি নিয়ে কোথায় নবউদ্যোমে ঝাঁপিয়ে পড়বে দল পুনর্গঠনে, কিন্তু তা আর সহজে হচ্ছে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট মহল। আন্দোলনের হুমকি আর স্বাগত মিছিলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় রীতিমত শঙ্কিত তারা।

এদিকে দীর্ঘদিন থেকে সিলেট ছাত্রলীগে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভিন্ন গ্রুপ ও উপ-গ্রুপ। সিলেট ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করতে বিভিন্ন বলয় থেকে যোগ্য নেতাদের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি।

কিন্তু ছাত্রলীগের কমিটির রেশ ধরেই এরমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে সিলেট আওয়ীলীগে। একপক্ষ অবস্থান নিয়েছেন কমিটির পক্ষে অপর পক্ষ কমিটি ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কমিটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার সাহা ও জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট রণজিৎ সরকার।

আর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমেদ, জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান ও মহানগরের সহ সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ।
তাদের অভিযোগ কমিটি গঠনে ছাত্রলীগের দ্বায়িত্বশীল নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেননি।

ছাত্রলীগের নব গঠিত কমিটিতে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে টিলাগড় গ্রুপের নাজমুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তেলিহাওর গ্রুপের রাহেল সিরাজের নাম ঘোষনা করা হয়। এছাড়া মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দর্শনদেউড়ি গ্রুপের কিশওয়ার জাহান সৌরভ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাশ্মির গ্রুপের নাঈম আহমদের নাম ঘোষণা হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় ৬ জনের নাম। তারা হলেন- জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান, বিপ্লব কান্তি দাস, মুহিবুর রহমান মুহিব, কনক পাল অরূপ, হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ও সঞ্জয় পাশী জয়। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির দুই সদস্য জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান ও মুহিবুর রহমান মুহিব কমিটি ঘোষনার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পদত্যাগ করেন।

এদিকে, তেলিহাওর গ্রুপের রাহেল সিরাজ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেলেও গ্রুপের অভ্যন্তরে অসন্তোষ চরমে পৌঁছায়। তেলিহাওর গ্রুপের বড় অংশের নেতাকর্মীরা রাহেল সিরাজের পরিবর্তে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চেয়েছিলেন জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খানকে। কিন্তু জাওয়াদকে সাধারণ সম্পাদক না করে কেন্দ্রীয় সদস্য করায় গ্রুপটির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে। পরে টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন পদবঞ্চিতরা। একই সময় নব গঠিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ মিছিল করে করা হয়। এইদিন সন্ধ্যায় রাহেল সিরাজের বাসায়ও হামলা চালায় নিজ গ্রুপের কর্মীরা। আর নিজ বলয়ে উপেক্ষিত জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন দুই কমিটির শীর্ষ নেতারা। তবে এই মূহূর্তে নিজ বলয়ে ভেড়াতে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন তারা। শেষ পর্যন্ত জেলার কোনও নেতা রাহেল সিরাজের দায়িত্ব না নিলে লন্ডন আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতা তাকে শেল্টার দেবেন বলে আভাস রয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় দুইযুগ ধরেই ছাত্রলীগের কমিটিতে আধিপত্য ছিল ‘তেলিহাওর গ্রুপ’র নিয়ন্ত্রক জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খাঁন, দর্শন দেউড়ি গ্রুপ’র নিয়ন্ত্রক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, কাশ্মীর গ্রুপের নিয়ন্ত্রক মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার সাহা ও টিলাগড় গ্রুপের নিয়ন্ত্রক জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট রণজিৎ সরকার অনুসারীদের।

এর পর ২০১৫ সালে দীর্ঘদিনের আধিপত্যে ভাগ বসান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমেদ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আাজাদুর রহমান আজাদ। সে কমিটিতে কাশ্মীর গ্রুপকে মাইনাস করে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক হন শাহজালাল ব্লকের নিয়ন্ত্রক আসাদ উদ্দিন আহমেদের অনুসারী আব্দুল আলিম তুষার। অপরদিকে জেলায় টিলাগড় গ্রুপকে মাইনাস করে সাধারণ সম্পাদক হন আজাদুর রহমান আজাদ অনুসারী রায়হান চৌধুরী।

সর্বশেষ ২০২১ সালেও পুরোনো চার ছাত্রলীগ নেতা তাদের বলয়ের আধিপত্য ধরে রাখলেও বাদ পড়ে আসাদ উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা শাহজালাল ব্লক। তবে তেলিহাওর গ্রুপ থেকে জেলা ছাত্রলীগে রাহেল সিরাজ সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হলেও বলয়ে কোণঠাসা রয়েছেন তিনি। তাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মেনে নিতে নারাজ নিজ বলয়।

তবে দলীয় একটি সূত্র জানায়, তেলিহাওর গ্রুপ ও রাহেল সিরাজের মধ্যকার বিবাধ নিস্পত্তিতে কাজ করছে দলীয় একটি অংশ। বর্তমানে রাহেল সিরাজসহ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের শীর্ষ চার নেতাই ঢাকায় অবস্থান করছেন। তেলিহাওর গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি হলে গ্রুপেই ফিরবেন রাহেল। অন্যথায় বিমানযোগে দু-একদিনের মধ্যে টিলাগড়, দর্শনদেউড়ি ও কাশ্মির গ্রুপের সমন্বয়ে সিলেটে ফিরবেন রাহেল সিরাজসহ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের শীর্ষ চার নেতা। পরে বিশাল শোডাউন করে নিজেদের অবস্থান জানান দেবেন তারা।

তবে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজ জানান, নাসির উদ্দিন খান আমার রাজনৈতিক অভিভাবক। আমার সফলতা কেন আমার গ্রুপের অনুসারী ও সহকর্মীরা মেনে নিতে পারছেনা? তা আমার বোধগম্য নয়।

অপরদিকে সিলেট ছাত্রলীগের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তৃণমূল ছাত্রলীগ।বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠনে এমন পরিস্থিতির পিছনে গ্রুপিং রাজনীতিকে দায়ী করছেন তারা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রাণ ফিরেছে ছাত্রলীগে।
তৃণমূল নেতৃবৃন্দ জানান, সামাজিক রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে ছাত্রলীগের বিশাল একটা ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে সিলেট আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বিদ্যমান থাকলে সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে সহযোগিতার বদলে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যহত হবে। সেই সাথে রাজনৈতিক সৌহার্দ্য’র অন্ততম অন্তরায় হয়ে উঠবে।

শেয়ার করুন