১১ আগস্ট ২০২১
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেট অঞ্চলে মহামারি করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর রূপ বদলায়নি। শনাক্তের হার কিছুটা কমলেও থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল। চলতি মাসের গেল ১০ দিনেই সিলেট বিভাগে ১২৯ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলার মারা গেছেন ৯৬ জন। এ সময়ে প্রায় ৭ হাজার লোকের কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে।
আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সিলেট জেলার বাসিন্দা। স্বাস্থ্য বিভাগের দেয়া তথ্য পর্যালোচনা করে সিলেটের করোনার এমন ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। করোনার এমন চিত্রের মাঝে আজ থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলার পাশাপাশি গণপরিবহন চলাচলও শুরু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীনের মতে, একসাথে লকডাউন তুলে নেয়াটা ঠিক হয়নি। ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করলেও হতো। কারণ এখনো অনেক এলাকায় আক্রান্তের হার ৩০ শতাংশের উপরে রয়েছে। যেসকল এলাকায় আক্রান্তের হার কমে এসেছে; কেবল ওই এলাকায় লকডাউন তুলে নেয়া হলে ভালো হতো। তবুও, যেহেতু সরকার লকডাউন তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন বিকল্প নেই। যেভাবেই হোক স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে এবং ঘরের বাইরে সকলকে মাস্ক পড়তেই হবে। এখন কিন্তু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন নয়; ফ্যামিলি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা লাইক ইনলেস (অসুস্থতা) যেমন হাঁচি, কাশি বা জ্বর আছে; তাদেরকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা দ্রুত পরীক্ষা করে জেনে নিতে হবে। করোনা ধরা পড়লে আইসোলেটেড হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। তিনি করোনার ভ্যাকসিন নেয়ার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. ময়নুল হক বলেছেন, মানুষের জীবনমান রক্ষায় সরকার লকডাউন শিথিল করেছে। করোনার সংক্রমণ চলছে। করোনা থেকে রক্ষা পেতে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। গণটিকা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়া। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। বিশেষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ দিনে এ বিভাগে ১২৯ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৯৬ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ১০ জন, মৌলভীবাজার জেলায় ৫ জন ও হবিগঞ্জ জেলায় ১০ জন ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে ৮ জনের মৃত্যু হয়। এক সপ্তাহে করোনা শনাক্ত হয় ৬ হাজার ৯৯৪ জনের। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩ হাজার ৮০৪ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৮০৭ জন, মৌলভীবাজার জেলায় ১ হাজার ১৯৭ জন ও হবিগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ১১৭ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়ে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টার আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ওসমানী হাসপাতালে মারা যান ৮ জন, সিলেট জেলার ৭ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১ জন ও অন্যজন হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এসময়ে ২ হাজার ৫৪টি নমুনা পরীক্ষায় ৫৯০ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ২৫৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ১০৫ জন, মৌলভীবাজার জেলার ৬৭ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ১০১ জন।
গত পরশু সোমবারও করোনায় সিলেটে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সিলেট জেলার ১৫ জন, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় ১ জন করে মারা যান। এদিন ২ হাজার ৩৯টি নমুনা পরীক্ষায় ৭০২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৪২৯ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৮৬ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১০৬ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৮১ জন।
৮ আগস্ট রোববার ৭ জন মারা যান। তাদের মধ্যে সিলেট জেলার ২ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৩ জন, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১ জন করে মারা যান। এদিন ১ হাজার ৯০৮টি নমুনা পরীক্ষায় ৫৯১ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়ে। শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ২৯০ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৭১ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১৮৮ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৪২ জন।
৭ আগস্ট শনিবার ৪ জনের মৃত্যু হয়। তারা সিলেট জেলার বাসিন্দা। এদিন ১ হাজার ৫৫টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয় ৩৫২ জন। শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আক্রান্তদের ১৮২ জন সিলেট জেলার, ৩৭ জন সুনামগঞ্জ জেলার, ৩৪ জন মৌলভীবাজার জেলার ও ৯৯ জন হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।
৬ আগস্ট শুক্রবার ১ হাজার ৯৬৭টি নমুনা পরীক্ষায় ৭৫৮ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়ে। শনাক্তের হার ৩৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এদিন করেনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জন সিলেট জেলার, মৌলভীবাজার জেলার ১ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ২ জন। এদিন সিলেট জেলার ৪৬৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৫১ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১৯১ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৫১ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
৫ আগস্ট বৃহস্পতিবার ১৩ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সিলেট জেলার ১২ জন ও অপরজন হলেন মৌলভীবাজার জেলার। এদিন ১ হাজার ৮৫৩টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয় ৭৩১ জনের। শনাক্তের হার ৩৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৪৪৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৬০ জন, মৌলভীবাজার জেলার ৯১ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ১৩৫ জন।
৪ আগস্ট বুধবার ২০ জনের মৃত্যু হয়। দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর এদিনই সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ ২০ জন রোগী মারা যান। এর আগে ২৮ ও ৩০ জুলাই ১৭ জন করে রোগীর মৃত্যু হলেও এদিন সিলেট অঞ্চলের লোকজনকে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখতে হয়েছে। এর আগে কখনো ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনায় এত সংখ্যক লোকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ২০ জনের মধ্যে সিলেট জেলার ১৬ জন , সুনামগঞ্জ জেলার ৩ জন ও অপরজন হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এদিন ১ হাজার ৯১০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৭১৫ করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ৩৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৪৫৪ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৯৭ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১২৬ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৩৮ জন।
৩ আগস্ট মঙ্গলবার মারা গেছেন ১২ জন। তাদের মধ্যে সিলেট জেলার ১০ জন ও মৌলভীবাজার জেলার ২ জন। এদিন ২ হাজার ৪১টি নমুনা পরীক্ষায় ৭১০ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়ে। শনাক্তের হার ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ৪০৬ জন সিলেট জেলার, ৮৭ জন সুনামগঞ্জ জেলার, ৬৪ জন মৌলভীবাজার জেলার ও ১৫৩ জন হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।
২ আগস্ট সোমবার ১৪ জনের মৃত্যু হয়। সিলেট জেলার ১০ জন, ২ জন হবিগঞ্জ জেলার ও সুনামগঞ্জ জেলার ১ জন ও অপরজন মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা। এদিন ১ হাজার ৯৫৪ টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয় ৮৫৩ জনের। শনাক্তের হার ৪৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৪৭৯ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ১০৭ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১৯০ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৭৭ জন।
১ আগস্ট রোববার ৯৯৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়। দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর এদিনই সকল রেকর্ড ভেঙে সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ সংখ্যক লোকের শরীরে কোভিড-১৯ বা করোনা শনাক্ত হয়। এদিন সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ২ হাজার ৫৬৬টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৩৯৯ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ১০৬ জন, মৌলভীবাজার জেলার ১৪০ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ৩৪০ জন। এর আগে ২৪ ঘণ্টায় গত ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ ৮০২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। মাসের প্রথম দিনে সিলেট জেলায় ৭ জন ও সুনামগঞ্জ জেলায় ২ জনসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ, সিলেট-এর বিভাগীয় পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় স্বাক্ষরিত দৈনিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে করোনা শনাক্তের পর থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৪৬ হাজার ৪৫৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে । এর মধ্যে সিলেট জেলায় ২৪ হাজার ৯৩৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৫ হাজার ৪১২ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ৫ হাজার ৬২৩ জন, মৌলভীবাজার জেলায় ৬ হাজার ৬১৬ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ হাজার ৮৬৮ জন। এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৮২২ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৬০৯ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৫৯ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ৪০ জন, মৌলভীবাজার জেলায় ৬৫ এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৭ জন।
সিলেট বিভাগে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার আরও ৩০৭ সুস্থ হয়েছেন। সুস্থ হওয়া রোগীদের মধ্যে সিলেট জেলার ২১২ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৬৫ জন, মৌলভীবাজার জেলার ২১ জন ও হবিগঞ্জ জেলার ২ জন। এছাড়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ৮ রোগী সুস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩৩ হাজার ৮৩৭ জন সুস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ২২ হাজার ৭৬৬ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৩ হাজার ৬৭৬ জন, হবিগঞ্জ জেলার ২ হাজার ৬৭২ জন, মৌলভীবাজার জেলার ৪ হাজার ৪২৪ জন ও সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে ২৯৯ জন সুস্থ হন।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩৬ জন রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৩ জন, হবিগঞ্জে ৬ জন, মৌলভীবাজারে ৯ জন ও সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে ৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮১৪ জন। এর মধ্যে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৪৬ জন, সুনামগঞ্জে ৬৮ জন, হবিগঞ্জে ৫২ জন, মৌলভীবাজারে ৩৬ জন ভর্তি রয়েছেন। এছাড়াও ওসমানী হাসপাতালে ৩১২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সিলেট বিভাগে গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৯৬ জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয় বলে জানানো হয়েছে।