৭ আগস্ট ২০২১
বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি : ‘ডাক্তারের চেম্বার হতে বের হওয়া মাত্রই হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নেন একজন ত্রিশোর্ধ্ব মহিলা। পরে এমন ভাব নিয়ে ব্যবস্থাপত্র দেখছিলেন যেন তিনি হাসপাতালের দায়িত্বরত কেউ।
ব্যবস্থাপত্র দেখেই তিনি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বলে সেখানে যাবার নির্দেশ দিয়ে তিনি বললেন, এই পরীক্ষাটা শুধুমাত্র সেখানেই করা হয়।’ – অভিযোগের সুরে কথাগুলো বলছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মরিয়ম বেগম।
শুধু মরিয়ম বেগমই নন, এমন অভিযোগ রয়েছে আরও অনেক ভুক্তভোগীর। এমনিতেই বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জড়িত হয়ে পড়েছে। আর উপর বিভিন্ন ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের দৌরাত্ম্যে যেন রোগীরা আরও বেশি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। এতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। এমনকি প্রায়শই ঘটছে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা। তবুও টনক নড়ছেনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা সবসময় হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঘুরাঘুরি করে। অনেকে আবার হাসপাতালের ডাক্তারের চেম্বারের মধ্যে অবস্থান করে। চিকিৎসকরা সাধারণ রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিলেই এসব দালালরা পাগল হয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে নেয়ার জন্য। এতে তাদের হাতে রোগী ও স্বজনদের নাজেহাল হতে হয়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা গেছে, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের আনাগোনা। অনেকেই চিকিৎসকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চেম্বারের মধ্যেও অবস্থান করেন। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীদের বিভিন্ন ধরনের টেস্টের জন্য পরামর্শ দেন। তবে ডাক্তাররা যে টেস্টের নামই লিখুক না কেন নিজেদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের পাঠাতে বাধ্য করে থাকে সেখানে পূর্বেই অবস্থান নেয়া কয়েকটি নির্দিষ্ট দালাল সিন্ডিকেট। বিনিময়ে এসব দালালরা পকেটে পুরে নেন কমিশনের নগদ টাকা। আর প্রতিদিনই তাদের খপ্পরে পড়ে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, হাসপাতালের অভ্যন্তরের প্রতিদিনই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেলস এন্ড মার্কেটিং চক্রের ৮-১০জন সদস্য সক্রিয় থাকে। এদের মধ্যে সিটি ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাকি ও জিসান, দি মেডি এইড প্যাথলজি সেন্টারের সুহেল ও জীবান, সেন্ট্রাল মেডিকেয়ার সার্ভিসের মিজান ও জাহিদ এবং ক্লাসিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মিনারাসহ কয়েকজনের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। নিজেদের পছন্দসই ডায়ানাস্টিক সেন্টারে রোগী টানতে গিয়ে অনেক সময় এই দালালদের মধ্যে তৈরি হয় ঝগড়া-বিবাদ। পরে আবার হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সরা সেইসব সমস্যার সমাধানও করে দেন।
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করলেও হাসপাতাল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এই ব্যাপারে বক্তব্য দিতে রাজি হননি হোসেন মোহাম্মদ মহসিন, রিফাতুল ইসলামসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমো। তবে আফরা আনান মৃদু নামে হাসপাতালের আরেক মেডিকেল অফিসার জানান, হাসপাতালের অভ্যন্তরে অনেক সময় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে এমন ছেলে-মেয়েদের প্রায়ই দেখতে পান তিনি। চেম্বার থেকে চোখাচুখি হলে তারা সালাম দিয়েই কেটে পড়ে। তবে কখনোই তার চেম্বারে প্রবেশ করেনি বলে জানান তিনি।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আবু ইসহাক আজাদ জানান, এসব বিষয়টি একাধিকবার হাসপাতাল প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের নজরে দিয়েও সমাধান হয়নি। এমনকি সবকটি ডায়গনাস্টিক সেন্টারের মালিক পক্ষের সাথেও আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সকলেই কথা দিয়েও কথা রাখেননি। এদের উৎপাতে চিকিৎসাসেবা প্রদান অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কথা জানতে চাইলে শৃঙ্খলাবোধ ও সুব্যবস্থাপনা ধরে রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ উল্লেখ করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম আলী খান চৌধুরী বলেন, কিছুদিন পূর্বে এই ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছিল। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেলস এন্ড মার্কেটিং বিভাগের সাথে জড়িতদের প্রবেশে তাদেরকে নিষেধ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তাছাড়া এসব বিষয় নিয়ে আমাদের কোন চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ রোগী আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ জানায়নি। তবে যদি কেউ অভিযোগ করেন তাহলে আমরা আরও প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবো।