১৫ মে ২০২১


আতঙ্কে মোটরসাইকেল রাইডাররা

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপাের্ট : সিলেটে পাঠাও-উবারসহ বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক যাতায়াত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত মোটরসাইকেল রাইডারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এক মাসের ব্যবধানে সিলেটে একজন মোটরসাইকেল রাইডারকে হত্যা এবং আরেকজনকে হত্যাচেষ্টা করে মোটরসাইকেলসহ সবকিছু ছিনতাইয়ের ঘটনায় বিরাজ করছে এ আতঙ্ক।

সিলেটে অ্যাপসভিত্তিক মোটর পরিসেবা চালু হওয়ার পর থেকে অনেক বেকার তরুণ জড়িয়ে পড়েছেন এ পেশায়। প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করে ভালই আয় করছেন তারা। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বের করতে পেরেছেন নিজেদের। যানজটের মধ্যে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সিলেটে অনেক তরুণদের অর্থ আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এ পরিসেবা।

তবে সিলেটে এক মাসের ব্যবধানে একজন মোটরসাইকেল রাইডারকে হত্যা এবং আরেকজনকে হত্যাচেষ্টা করে গাড়িসহ সবকিছু ছিনতাইয়ের ঘটনায় তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে এ পেশায় জড়িতদের মধ্যে।

ঈদের আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে মোগলাবাজার থানার হাজীগঞ্জ মুহাম্মদপুর এলাকার একটি ডোবা থেকে উবার চালক রেদওয়ান রশীদ চৌধুরী সৌরভ (৩০)-এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর ৩ দিন আগে তিনি নিখোঁজ হন।

জানা গেছে, রেদওয়ান রশীদ চৌধুরী সৌরভ সিলেট শহরের সোবহানীঘাটে এক আত্মীয়ের বাসায় থেকে উবারের মোটরসাইকেল ড্রাইভিং পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। গত ৩ দিন আগে (১১ মে) মোটরসাইকেলসহ তিনি নিখোঁজ হন। এরপর সম্ভাব্য স্থানে তাকে খোঁজখুজি করে পাওয়া না যাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে স্বজনরা ঘটনাটি জানালে পুলিশ সৌরভের মোবাইল ট্র্যাকিং করে দেখতে পারে মুহাম্মদপুর এলাকায় তার মোবাইলের নেটওয়ার্কের অবস্থান। পরে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে একটি ডোবা থেকে সৌরবের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, সৌরভের নিখোঁজের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা রাতে একটি নাম্বার থেকে কল দিয়ে সৌরভের দুলাভাইয়ের কাছে অজ্ঞাত একজন জানায় সৌরব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। তার রক্তের প্রয়োজন টাকা লাগবে। তখন সৌরভের স্বজনরা সোবহানিঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে ছিলেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানালে পুলিশ ঐ নাম্বারের অবস্থান ট্র্যাকিং করে হাজীগঞ্জে অবস্থান দেখতে পায়। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে একটি ডোবার পাশে প্রথমে সৌরভের হেলমেট পাওয়া যায়। পরে ডোবায় লাশও মিলে।

এর আগে গত ৯ এপ্রিল সিলেটে মোটরসাইকেল রাইডার রাজুকে মৃত ভেবে যাত্রী ছাউনীতে ফেলে গিয়েছিল অপহরণকারী। পরে স্থানীয় লোকজন গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ঘটনার তিন সপ্তাহের মাথায় জ্ঞান ফিরেছে রাজুর। রাজু এখনো সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালের ১১নং সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। রাজু সিলেট নগরীর উত্তর বালুচর আল-ইসলাহ আবাসিক এলাকার মৃত আকদ্দছ আলীর পুত্র। তার মূল বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ঢারখখাই আদিনাবাদকাপন গ্রামে।

জানা গেছে, উত্তর বালুচর বোনের বাসায় থেকে মোটরসাইকেল রাইডারের কাজ করতো সে। মোটরসাইকেল রাইডার গোলাম কিবরিয়া রাজু গত ৮ এপ্রিল মোটরবাইক নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে আর বাড়ি ফিরেননি। রাত ১০টার দিকে তাকে মোটরবাইকসহ সিলেট কদমতলিস্থ হুমায়ুন রশিদ চত্বর এলাকায় কেউ কেউ দেখতে পান বলে তার ভাই গিয়াস জানান। পরদিন সকাল পৌনে ৮টার দিকে মোগলাবাজার থানার গফুরগাঁও এলাকার একটি যাত্রী ছাউনী থেকে গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে প্রেরণ করে পুলিশ। এ সময় তার সঙ্গে থাকা মোটরবাইক, মোবাইল ফোন ও টাকা কিছুই পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে স্বজনরা ওসমানীতে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।

পরে তাকে নগরীর উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ১২ই এপ্রিল তাকে ফের ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়। এ ঘটনায় রাজুর ভাই গিয়াস উদ্দিন বাদি হয়ে গত ১০ই এপ্রিল মোগলাবাজার থানায় মামলা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

এক মাসের ব্যবধানে সিলেট ঘটে যাওয়া এই দুই ভয়ঙ্কর ঘটনায় এখন মোটরসাইকেল রাইডাররা তাদের জীবন ও পেশা হুমকির মুখে বলে মন্তব্য করছেন।

উবার এর তালিকাভুক্ত রাইডার দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা লিটন আহমদ এ প্রতিবেদককে জানান, ‘এই দুই ঘটনা আমাদেরকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এখন আমরা নিজেদেরকে অরক্ষিত মনে করছি। যাত্রীবেশে কোনো দুর্বত্ত, ছিনতাইকারী বা হালমাকারী যে আমাদের মোটরসাইকেলে উঠছে না, সেটি আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না।’

বিকল্প আর কিছু পেলে ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশা ছেড়ে দেবেন বলে জানান তিনি।

আব্দুল মালেক নামের আরেক রাইডার বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ধর্ণা দিয়েও কোনো চাকির না পেয়ে অবশেষে জীবন-জীবিকার তাগিদে, নিজেকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছি। কিন্তু দিন দিন বিভিন্ন কারণে এ পেশা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সিলেটে ঘটে যাওয়া এ দুই ঘটনা আমাকে বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য করছে।’

তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি- এই দুই ঘটনার সঙ্গে জড়িত দোষীদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দাবি দেয়া হোক। যাতে আর অন্য কেউ বা কোনো চক্র এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়।

শেয়ার করুন