২৬ অক্টোবর ২০১৭


বোমা মেশিনে ক্ষতবিক্ষত পর্যটন কন্যা জাফলং

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক : পাহাড়-নদী ও সবুজ প্রকৃতির জাফলং দিনে দিনে বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। আর এর মূলে রয়েছে যন্ত্রদানব বোমা মেশিন। এই যন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভের ৭০-৮০ ফুট গভীর হতে পাথর উত্তোলন করায় তীর ধসে যাচ্ছে নদীগর্ভে। এরফলে পিয়াইন নদীর তীরবর্তী নয়াবস্তী, কান্দুবস্তি, মন্দিরের জুমের প্রকৃতি নষ্ট হচ্ছে, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে ১৫শ পরিবারের বাসস্থান। শুষ্ক মৌসুম শুরুর পূর্বমুহূর্তে যন্ত্রদানব বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হয়।

দলমতনির্বিশেষে সর্বদলীয় ‘যৌথ বোমা মেশিন চক্র’ নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি ও মন্দিরের জুম এলাকায় প্রায় ৩০ হতে ৩৫টি ভাসমান বোমা মেশিন স্থাপন করে পরিবেশ ধ্বংসের মহাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই ‘বোমা বাহিনী’’ অবাধে পাথর উত্তোলনের কাজ করছে। বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় আশপাশের ভূমি ধসে নদীতে বিলীন হচ্ছে নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি ও মন্দিরের জুম এলাকা। ধ্বংসযজ্ঞ এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২ বৎসরের মধ্যে জাফলংয়ের মানচিত্র হতে হারিয়ে যাবে মন্দ্রিরের জুমসহ দুটি গ্রাম। বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে হবে নয়াবস্তি ও কান্দুবস্তির প্রায় ১৫শ পরিবার।

সম্প্রতি অভিযানের পর দুদিন বন্ধ থাকার পর ২০ অক্টোবর হতে পুনরায় বোমা মেশিন বাহিনী ধ্বংস যজ্ঞে মেতে উঠেছে। বোমা মেশিন চালানোর ক্ষেত্রে চক্রের সাথে জড়িত রয়ছেন সরকার ও বিরোধী দলের প্রভাবশালীরা। এই বাহিনী জাফলংয়ের প্রকৃতি ধ্বংস করে তাদের সুবিধা হাসিল করছে।

জাফলংয়ের নয়াবস্তি ও কান্দুবস্তির বাসিন্দারা জানান, পাথর কোয়ারি এলাকায় একসময় সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন হতো। পানিতে নেমে হাত দিয়ে পাথর উত্তোলনের জন্য তখন হাজার হাজার পাথর শ্রমিক আর বারকি নৌকার আনাগোনা ছিল । তখন জাফলংয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি সাধন হয়নি। কয়েক বৎসর পূর্বে কম সময়ে বেশি পাথর তোলার জন্য এক শ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে বোমা মেশিনের ব্যবহার শুরু করে।

২০০৯ সালের দিকে বড় বড় পাইপ দিয়ে মাটির প্রায় ৫০ থেকে ৮০ ফুট গভীর হতে পাওয়ার পাম্প যন্ত্রের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। ওই যন্ত্র দিয়ে পাথর তোলার সময় বোমার মতো শব্দ হয় বলে এই যন্ত্রের নামকরণ করা হয় ‘বোমা মেশিন’।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভারত সীমান্ত থেকে বাংলাদেশে নেমে আসা পিয়াইন আর ডাউকি নদের তীরজুড়ে সারি সারি বোমা মেশিন। বড় বড় পাইপ বসিয়ে মাটির গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে পিয়াইন নদের উৎসমুখের পার্শ্ববর্তী জাফলং চা-বাগানের প্রায় ৩০০ একর ভূমি। জাফলংয়ের ওপারে আদিবাসী পল্লির দুটি পানপুঞ্জিও নদীগর্ভে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে। বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ না হলে পুরো জাফলং বড় রকমের ভূমিধসের মুখে পড়বে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা।

এক একটি বোমা মেশিন দৈনিক চালাতে ২০ হতে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয় একটি যৌথ বোমা মেশিন চক্রকে। তারা টাস্কফোর্সের অভিযান নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে সাইফুল্লাহ স্ট্রোন ক্রাশারের মালিক আলাউদ্দিন নামে একজন। সে একসময় বিএনপির রজনীতি করলেও এখন সরকার দলের নেতাদের প্রিয়পাত্র।

তবে আলাউদ্দিন দাবী করেন, বোমা মেশিন কি জিনিস তিনি চিনেন না।

আর টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলেন, জাফলংয়ের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত অভিযান করছি এবং অভিযান অব্যাহত রেখেছি। অপরাধীদের কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ এ যন্ত্রের ব্যবহার কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা তদন্ত করে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করার।

সারী নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও লেখক আব্দুল হাই আল হাদি জানান, পরিবেশে ঠিক রাখার জন্য দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের একার নয়। এলাকাবাসীকে সচেতন হতে হবে। এলাকাবাসী সচেতন হলে জাফলংয়ের পরিবেশ রক্ষা হবে। পরিবেশবিধ্বংসী সকল কর্মকান্ড বন্ধে স্থানীয় এলাকাবাসীকে নিয়ে কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

 

(আজকের সিলেট/২৬ অক্টোবর/ডি/এসটি/ঘ.)

শেয়ার করুন