১৯ ডিসেম্বর ২০২০


সুরমায় বিলীন হচ্ছে আমবাড়ি বাজার

শেয়ার করুন

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জ জেলার প্রাচীন একটি জনপদের নাম আমবাড়ি বাজার। বাজারটির অবস্থান দোয়ারাবাজার উপজেলায়। জেলার বৃহৎ অন্যতম এই বাজারটির অস্থিত্ব এখন হুমকীর মুখে। ইতোমধ্যে বাজারের বেশিরভাগ ভূমি বিলীন হয়ে গেছে সুরমায়। বাজারের অনেক স্থাপনাগুলোও বিলীন হবার পথে। দীর্ঘ দিন বাজারটি নদী ভাঙ্গণের শিকার হলেও টনক নড়েনি কতৃপক্ষের। আবেদনের পর আবেদন জমা হয়ে বন্দি আছে লাল ফিতায়।

নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনের কারণে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে সব হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গেছে। ভাঙ্গনের শিকার এসব মানুষ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। নদী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন সুরমাপাড়ের মানুষজন।

সরেজমিনে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলাধীন আমবাড়ি বাজারটি অতি প্রাচীনতম একটি বাজার। সুরমা নদীর কুল ঘেঁষে এ বাজারটি বৃটিশ শাসনামলে গড়ে উঠে। সেই আমল থেকে সরকারি রাজস্ব যোগানে অত্যন্ত সহায়ক এই বাজার। এ বাজারে গড়ে উঠেছে মান্নারগাঁও ইউনিয়ন কমপ্লেক্স। ইউনিয়ন কমপ্লেক্সটি বর্তমানে ভাঙ্গনের হুমকিমুখে পড়েছে। এছাড়া বাজারের পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের অগনিত দোকানপাট রয়েছে। ব্যাংক, ডাকঘর, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আমবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, খেলার মাঠ, আমবাড়ি-আদারবাজার গোদারাঘাট, গোবাদি পশু বিক্রয়ের হাটসহ অগনিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে আমবাড়ি বাজার।

গোদারাঘাটের সিঁড়ি না থাকায় ওই সীমারেখা দিয়ে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার হাট বসে। এ ছাড়া প্রতিদিন হাটের ন্যায় চলে ব্যবসা বাণিজ্য। ধান-চালের জন্য প্রসিদ্ধ এ বাজারটি ভাঙ্গনের মুখে পড়ে অগনিত দোকান পাট নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় থামছে না ব্যবসায়ী ও বসতিদের আহাজারী আর কান্না। পাল্টে গেছে বাজারের মানচিত্র। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এ বাজার হতে মালামাল ক্রয় করে নিয়ে যান। নদীপথে ও সড়ক পথে দেদারসে চলে ব্যবসা-বাণিজ্য। দুর-দুরান্তের ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় ধান-চাল কাঠ ইত্যাদি আমদানি রপ্তানি করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে প্রাচীনতম অনেক স্থাপনা ভাঙ্গনের হুমকির মুখে পড়ায় স্থানীয় বসতি ও ব্যবসায়ীরা হতাশায় দিবারাত কাটাচ্ছেন।

ভুক্তভোগী বাজার ব্যবসায়ী ও বসতিরা জানান, এ বাজারে গড়ে উঠেছে কয়েকটি অত্যাধুনিক মিনি সুপার মার্কেট। মনোরম পরিবেশে কেনাকাটা চলে বাজারে। প্রতি অর্থবছরে বিপুল পরিমান অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাজার ইজারা নিতে হয়। অথচ সরকারিভাবে ভাঙ্গন প্রতিরোধের কোন উপায় তারা দেখছেন না। ফলে স্থানীয় বসতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। নদী পার্শ্ববর্তী যোগীরগাঁয়ের মসজিদসহ কত স্থাপনা যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই !

বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা কৃপাসিন্ধু রায় ভানু বলেন, অব্যাহত নদীভাঙ্গণের মুখে বাজারটির অস্থিত্ব এখন হুমকীর মুখে। নদীভাঙ্গণের কারণে বাজারের প্রাচীন ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করতে পারছেনা নৌপথ। ফলে ব্যবসায়ীক ক্ষতির মুখে বাজারের ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, ভাঙ্গণরোধে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘হবে’ হচ্ছে’সহ বিভিন্ন ফরমালিটিজের কথা শুনিয়ে দেন। কিন্তু চলমান ভাঙ্গণ অবস্থায় বাজারের অধিবাসী এবং ব্যবসায়ীরা এখন প্রবল ঝুঁকির মুখে। বাজারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা কৃষ্ণ মোহন রায় বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ বরাবরে পৃথক পৃথকভাবে একাধিক আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আবেদনের প্রেক্ষিতে একবার পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক সরেজমিনে সার্ভে করে নিজেদের দায় সেরেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুেই হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, অবিলম্বে উপজেলার প্রাচীনতম এই বাজারটি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ’। তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বাজারের ব্যবসায়ী, সাবেক মেম্বার মো. জামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের পূর্বপুৃরুষের ঐতিহ্য ঘেরা বাজারের ভিটেমাটি, দোকানপাট হারিয়ে অনেকেই নি:স্ব হয়েছেন কিন্তু প্রতিরোধের কোন উপায় আমরা দেখছি না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাবিবুর রহমান বলেন, জেলার প্রতিটি ভাঙ্গন রোধে প্রকল্প গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। যদি অনুমোদন আসে তাহলে ভাঙ্গন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এই মূহুর্তে জরুরি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। তাও যদি অনুমোদন হয় তাহলে কাজ করতে পারবো।

শেয়ার করুন