৩ ডিসেম্বর ২০২০
নিজস্ব প্রতিবেদক : সেদিন সন্ধ্যায় প্রথমে এমসি কলেজ গেট থেকে স্বামী-স্ত্রী দুইজনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি করে সাইফুররা। পরবর্তীতে তরুণীর স্বর্ণালংকার ও তরুণীর স্বামীর পকেটে নগদ দুই হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা। এতেও ক্ষান্ত হয়নি সাইফুররা। সকল কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার পর সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম রাজন মিয়া মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন ওই তরুণীকে। এসময় তাদেরকে ধর্ষণ কাজে সহায়তা করে রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম।
কলেজ গেট থেকে তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি, নগদ ২ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যদিয়ে মূল ঘটনার সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ।
এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আসামিদের বিভিন্ন অপরাধ বিবেচনায় পৃথক ৩ টি মামলায় বিভিন্ন অপরাধে সকলকে অভিযোক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।
বৃহষ্পতিবার সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়।
এসময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ধর্ষণের ঘটনায় সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগে ৬ জনকে অভিযুক্ত করে ও ধর্ষণ কাজে সহযোতিতার অপরাধে মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে চার্জশিটটি আদালতে দাখিল করা হয়।
একই দিনে এ ঘটনার সময় ওই তরুণীর স্বামীকে মারধর, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা, নগদ ২ হাজার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পৃথক একটি মামলায় দণ্ডবিধি-৩৪২/৩৮৫/৩২৩/ ৩৭৯/৩৪ ধারায় পৃথক আরেকটি মামলায় ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
এর আগে ধর্ষণ ঘটনার পর পর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় আরও একটি মামলায়ও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এ মামলায় সাইফুর রহমান এবং শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনিকে অভিযুক্ত করে গত ২২ নভেম্বর অভিযুগপত্র দাখিল করা হয়েছে বলেও এসএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) রাত সাড়ে ৭ টার দিকে সিলেট এমসি কলেজের হোস্টেলে ওই গৃহবধূকে গণধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। অভিযুক্ত এসব কর্মীরা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় ৬ জনকে আসামি করে এসএমপির শাহপরাণ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্যাতিত ওই তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলায় আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমকে (২৫)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রেক্ষিতে র্যাব ও জেলা পুলিশের অভিযানে আটক ৮ জন কারাগারে আছে। গ্রেপ্তার সকলকেই ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলে তারা সকলেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।
অপরদিকে অপরদিকে গণধর্ষণের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও মহি উদ্দিন শামিম গঠিত বেঞ্চে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের হলরুমে গত ৪ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ ঘটনায় গণশুনানি হয়। পরে কমিটির সদস্যরা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের গণধর্ষণের ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ সাক্ষীদের জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করে গত ১৬ অক্টোবর ১৭৬ পৃষ্টার একটি তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্ট বেঞ্চে জমা দেওয়া হয়েছে। যার শুনানি হয় ২০ অক্টোবর। এদিন শোনানি শেষে প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ।
এদিকে গণধর্ষণের এ ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ২৬ অক্টোবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও কলেজের অধ্যক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দোহাই দিয়ে কলেজ কমিটির এ প্রতিবেদনটি সিলগালা করে রাখেন।
তাছাড়া গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব এবং সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন, সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসান।
এর আগে ঘটনার কয়েকদিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গণধর্ষণের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি এমসি কলেজে তদন্ত করতে আসে। তদন্ত শেষে তারা তাদের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।
এছাড়াও গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব এবং সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন, সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসান।