৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : নদী-খাল-বিলের ছোট মাছ ধরার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ এক ধরনের ফাঁদ। গ্রামাঞ্চলে মাছ ধরার আদি উপকরণের মধ্যে বাঁশের শলা ও বেত দিয়ে তৈরি পারন, ডরি, পলো বা পঁলুই সবচেয়ে জনপ্রিয়। অঞ্চলভেদে নামের ভিন্নতা থাকলেও মাছ ধরার উপকরণ হিসেবে মৌলভীবাজার অঞ্চলে ‘পারন’ এর অন্যরকম জনপ্রিয়তা রয়েছে জেলেদের কাছে। যার প্রভাব হাওড় অঞ্চলেই বেশি। জেলার হাওড় এলাকায় এ পারনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
মৌলভীবাজারের হাইল হাওরের বাইক্কা বিল তীরের গ্রাম বরুনা। এই গ্রামেই প্রতি মৌসুমে বিক্রি হয় লাখ টাকার পারন। মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত এই পারন কিনে নেন হাওরের স্থানীয় মাছচাষি ও জেলেরা। এই গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবারের জীবন জীবিকার অন্যতম উৎস এই পারন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন আকার ও আঙ্গিকে তৈরি মাছ ধরার যন্ত্রকে পারন, ডরি, পলো বা পঁলুই ইত্যাদি বাহারি নামে ডাকা হয়। মাছ ধরার ফাঁদ তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো বাঁশ ও সুতা। প্রথমে বিভিন্ন মাপে বাঁশের শলা তুলে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর শক্ত সুতা ও বেতের সাহায্যে বাঁশের শলাগুলো বিশেষভাবে বেঁধে কারিগররা এগুলো তৈরি করেন। এতে থাকে বিভিন্ন আকৃতির খোপ। এগুলোতে মাছ ঢোকার রাস্তা থাকে। কিন্তু বের হওয়ার কোনো রাস্তা বা উপায় থাকে না। অনেক সময় ফাঁদের মধ্যে টোপ হিসাবে শামুক-ঝিনুক ভাঙা এবং ভাত ও ধানের কুঁড়া দিয়ে তৈরি এক ধরনের মণ্ড ব্যবহার করা হয়। মাছ খাবার খেতে এর ভেতরে ঢোকে আর বের হয়ে আসতে পারে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের বরুনা গ্রামের এক বাড়ির উঠানে বাঁশ আর বেত নিয়ে বসেছেন কল্পনা রাণী সরকার। নিজের হাত দিয়ে বুনছেন পারন। বাশেঁর শলার সঙ্গে সুতা বেঁধে দিচ্ছেন আপনমনে। তারপাশে বসে বাড়ির অন্যান্য নারী ও পুরুষরা এই পারন বানানোর কাজ করেন। যুগ যুগ ধরে এই বাড়িতে পারন বানানোর কাজ চলে আসছে।
পারন বানিয়ে এখন আর তেমন লাভ হয় না জানিয়ে কল্পনা রানী সরকার বলেন, একটা পারন তৈরিতে ৩ থেকে ৪ দিন লেগে যায়। মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষরাও এই কাজ করেন। একটি বড় বাঁশ দিয়ে প্রায় ১২টির মতো পারন তৈরি করা যায়। ২০টি পারন বানাতে প্রায় ১৬শ থেকে ১৭শ টাকা খরচ হয়। ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২শ টাকায় বিক্রি করি। যারা পারন কিনতে চান তারা বাড়িতে এসে কিনে নিয়ে যান।
৩০ বছর ধরে পারন বানাচ্ছেন ঠাকুর মনি সরকার। তিনি বলেন, এটা আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে করে আসছি। আসলে শেষমেষ পুষায় না। জান বাঁচিয়ে কোনোরকমে চলা যায়। বাঁশ, বেত, সুতা লাগে। এসব কিনে আনতে হয়। ঘরের সবাই মিলে কাজ করে লাভ হয় ৪ থেকে ৫শ টাকা। এটা দিয়ে আমাদের চলে না। এই শিল্পকে রক্ষা করতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। এটা আসলে মৌসুমী ব্যবসা। দেশি ছোট মাছ ধরতে এগুলো ব্যবহার হয়। কেউ ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পারন বিক্রি করেছেন। সবমিলিয়ে এই গ্রামে লাখ টাকার বেশি পারন বিক্রি হয়।
নগেন্দ্র সরকার বলেন, ২৫ বছর ধরে পারন বানাচ্ছি। এখনও বৃদ্ধ বয়সে বানাতে পারি। আমাদের পরে আর কেউ পারন বানাবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ আমাদের ছেলে মেয়েরা আর এসব কাজ করে না। তাদের কেউ লেখাপড়া করে, কেউ অন্যকাজ করে।
মাছ ধরার ফাঁদ কিনতে আসা ক্রেতা জেন্টু মিয়া বলেন, আমি হাওরে একটি বিল লিজ নিয়েছি। সেখানে গিয়ে পারন দিয়ে মাছ ধরব। মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করি। এটা আমার জীবিকা।
বাইক্কা বিলের বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিন্নত আলী বলেন, এই গ্রামের অনেক লোক পারন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মৌসুমে লাখ লাখ টাকার পারন বিক্রি হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মাছ ধরার কাজে পারনের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। এটা আমাদের ঐতিহ্য বলা যায়। এটিকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
গ্রামের খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় বা নদীতে মাছ ধরার পুরনো পদ্ধতি ও উপকরণের মধ্যে বাঁশের ফাঁদ অন্যতম। কিন্তু দিনদিন জীবন জীবিকার এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। তবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে হয়তো এটিকে শিল্পে রূপ দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।