১৪ অক্টোবর ২০২০
গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি : গোয়াইনঘাটের ৫নং পূর্ব আলীরগাও ইউনিয়নের কাকুনাখাই খলা এলাকায় নদীর উৎস মুখে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা বিতর্কিত হিদাইরখাল বাঁধটি অপসারণে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যত কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যে কারণে বাধটির গড়ে তোলার শুরু থেকে এখনো শত শত পরিবারের দুর্ভোগ,বিড়ম্বনার প্রধান অন্তরায় হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিতর্কিত এই বাধটির কারণে গোয়াইনঘাটের সানকিভাঙ্গা,আসামপাড়া,আসামপাড়া হাওরের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের জনসাধারণের চরম দুভোগ ভোগান্তি ভোগ করতে হচ্ছে। পর্যন্ত চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে কয়েকশত হেক্টর জমির সব ধরণের চাষাবাদ।
বিতর্কিত এই হিদাইরখাল বাধটির কারণে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার নদীর তীরবর্তী এলাকায় নতুন নতুন ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়ে ঘরাবাড়ি,রাস্তাঘাট নদী গর্ভে বিলীনের মাধ্যমে বিপদগ্রস্থ হচ্ছেন জনসাধারণ। নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বদলে যাচ্ছে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার মানচিত্র।
অবৈধ এ বিতর্কিত এই বাঁধটি অপসারণের দাবীতে ইতিপূর্বে পরিবেশবাদী সংগঠন,সচেতন মহলের পক্ষ হতে বাঁধের উপর অবস্থান কর্মসূচি,মানববন্ধন ও গণজমায়েতসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। কিন্তু কৃত্রিম এ বাঁধটি অপসারণে দায়িত্বশীল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারও কোন টনক নড়েনি। অথচ বিতর্কিত ও অপরিকল্পিত এই বাঁধের কারণে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ভয়াভহ হুমকির মুখে পড়েছে।হিদাইরখাল বাঁধের কারণে শুধু কৃষি আবাদ কিংবা স্থানীয় যাতায়াত ব্যবস্থাই ধ্বংস হচ্ছেনা,পুরো এলাকাই মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
মানবসৃষ্ট বাধ দিয়ে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ রাখায় হিদাইর খাল বাঁধে প্রতি বছরই গিলে খাচ্ছে কয়েকশ’ হেক্টর জমির চাষাবাদ। সরজমিনে ঘুরে জানা যায়, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের প্রমত্তা একটি নদীটির নাম ‘বাউলিখাল’। সরকারি নথিপত্রেও নদীটির নাম বাউলিখাল হলেও স্থানীয়ভাবে এই নদী ‘হিদাইরখাল’ নামেই ব্যাপক পরিচিত। একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন ও লোটের আয়োজন পাকাপুক্ত করণে স্থানীয় মানুষের যাতায়ত সুবিধার অযুহাতে ২০১৬ সালে এ নদীর উৎস মুখে মাটি দিয়ে একটি বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহের পথ সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এতে করে শুধু প্রবাহমান বাউলিখাল নদীকেই গলাটিপে হত্যা করা হয়নি,পুরো একটি অঞ্চলের পরিবেশ,ভূ-প্রকৃতি ও স্থানীয় জীববৈচিত্রকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। হিদাইরখালে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করার পর থেকে কৃত্রিমভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রতি বছরই বাঁধের উজানে থাকা শুধু মাত্র গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের প্রায় ১৪-১৫ টি গ্রামের পাঁচ শতাধিক হেক্টর ফসলি জমির চাষাবাদ ব্যহত হয়ে আসছে। পাশাপাশি পাশ^বর্তী জৈন্তাপুর উপজেলার ২০-২৫টি গ্রামের কৃষি আবাদে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে।
এমনিতেই প্রমত্তা সারি নদী দিয়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে পলি ও বালি মাটি এসে প্রতি বছরই এসব জমি ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে ক্রমেই চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এসব এলাকার কৃষি জমি। এমতাবস্থায় হিদাইরখাল বাঁধের কারণে বন্যার সময়ে পানি ফুলে উঠে সারি নদীর দুই পাড় ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি। গত চার বছরে সারি নদীর দুই পাড়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তাঘাট এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি অর্ধশত বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পাহাড়ি ঢলে হিদাইরখালে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ থাকায় বন্যার পানির দ্বারা সারী-গোয়াইন সড়ক ও গোয়াইনঘাট-রাধানগর-জাফলং সড়কের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক ভাঙ্গনসহ সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্থ করে সড়ক দুটিতে যানবাহণ,পথচারী চলাচল বন্ধ হওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকত্ ও দুর্ভোগ ভোগ করছেন এলাকাবাসি। সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে তারা জানান, পাহাড়ি ঢলের সময় সারি নদীতে যে পানি প্রবাহিত হয় তার প্রায় এক তৃতীয়াংশ পানি এই বাউলিখাল নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো।
অথচ উৎসমুখে এই বাঁধ নির্মাণ করে হিদাইরখাল নদীর পানির প্রবাহ বন্ধ করার ফলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি ও অধিক স্রোতের কারণে বাঁধের উজানে থাকা দুই উপজেলার প্রায় ৩৪টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। যার মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের আসামপাড়া, আসামপাড়া হাওর, ছৈলাখেল অষ্টম খন্ড, ছৈলাখেল নবম খন্ড, সানকীভাঙ্গা হাওর,নয়াগাঙ্গেরপাড় ও বাউরবাগ হাওর (একাংশ), আলীরগাঁও ইউনিয়নের কাকুনাখাই, খলা, রাজবাড়িকান্দি, বুধিগাঁওহাওর, নাইন্দাহাওর, তিতকুল্লি হাওর, লম্বাডুবা, বালির হাওর এবং জৈন্তাপুর উপজেলার বিড়াখাই, হাটিরগ্রাম, গাথি, ডুল্টিরপার, চাতলারপার, শেওলারটুক, মল্লিফৌদ, কান্দি, বাউরভাগ, কন্যাখাই, ভিত্রিখেল, গুফরাজান, খাড়ুবিল, বরবন্দ, লামনীগ্রাম, কাটাখালসহ দুই উপজেলার উল্লেখিত এলাকার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষা করা এখন মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।
নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে ইতিমধ্যে সারি নদীর তীরবর্তী সানকীভাঙ্গা হাওর, বুধিগাঁও হাওর, শেওলারটুক ও নানইন্দার হাওর গ্রামের রাস্তাঘাট ও প্রায় অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে উল্লেখিত গ্রামের বর্ষাকালে পানির সৃষ্ট জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্যতার কারণে কৃষি জমির চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা এবং গবাদিপশু পালনেও প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। এই হিদাইরখাল বাঁধের কারণে ইতিপুর্বে জাইকার অর্থায়নে প্রায় ৫কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে নির্মিত বেড়িবাঁধ ও স্লইসগেইট প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। স্থানীয়ারা জানান,হিদাইরখালাল কোন ছড়া বা খাল নয়। আবহমানকাল থেকে চলা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া প্রাণবন্ত ও প্রমত্তা একটি নদীর নাম হচ্ছে হিদাইরখাল। অসংখ্য খাল-বিল-হাওর-বাওর-ফসলী জমির অস্তিত্বেও প্রাণভোমরা হচ্ছে এ নদী।
এই নদীর উৎসমুখে বাঁধ দেওয়া শুধু বেআইনী নয়, এটি প্রকৃতির উপর এক মারাত্বক নিপীড়ণ। স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের ব্যক্তিস্বার্থে নির্মিত এ বাঁধের কারণে উত্তর-পূর্ব সিলেটের পরিবেশ,প্রতিবেশ,ভূ-প্রকৃতি ও জনজীবন মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই অবিলম্বে অবৈধ এ বাঁধ অপসারণের জোর দাবী জানিয়েছেন তারা।
জৈন্তাপুরের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কামাল আহমদ জানান, পর্যটন সম্ভাবনার কথা বলে সম্পূর্ণ অন্যায় ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই হিদাইরখাল নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করাা হয়েছে। মুখে মুখে পর্যটনের কথা বলেলও এখানে পর্দার আড়ালে ছিলো স্বার্থানেশি মহলের একটা ষড়যন্ত্র মাত্র। বাঁধটি এখন গোয়াইনঘাটের পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের পাশাপাশি জৈন্তাপুরবাসিরও মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বাধের কারণে এলাকায় পানির স্থায়িত্ব ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। যে কারণে নদী ভাঙ্গনও বাড়ছে।
পরিবেশবাদী ও সারি নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবদুল হাই আল হাদী জানান, হিদাইরখালের উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক বন্ধ করা হয়েছে। যা প্রকৃতির সাথে চরম অন্যায় আচরণ বটে। হিদাইরখাল বাঁধ অপসারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অজুহাত দিয়ে বলেছে যে এটা নিয়ে নাকি তারা স্টাডি করছে। সম্প্রতি বুয়েটের ওই প্রতিনিধি দলও তাদের স্টাডি শেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে দ্রুত বিতর্কিত এই বাঁধটি অপসারণের জন্য সুপারিশ করেছে। আশা করা যায় এবার আর মরণফাদখ্যাত এই বিতর্কিত অবৈধ বাধটি উচ্ছেদে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবেনা।
গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুস সাকিব জানান, হিদাইরখাল বাধ অপসারণের দাবিটি যৌক্তিক। এটা নানা কারণে কৃষি ও নদী ভাঙ্গনসহ জনদর্ভোগের কারণ। বিষয়টি নিয়ে বিগত উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায়ও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমিও সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।