৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
আহমাদ সেলিম (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেটে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। পবিত্র ঈদুল আযহার পর সিলেট বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে মারা গেছেন ৪৫ জন। সবমিলিয়ে এ বিভাগে এ পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ১৯১ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। সবশেষ বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার এক স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মারা গেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট বিভাগে মারা যাওয়া ১৯১ জনের মধ্যে কেবল সিলেট জেলায়ই মারা গেছেন ১৩৯ জন। আর সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় ২০ জন করে এবং হবিগঞ্জ জেলায় মারা গেছেন ১২ জন।
সিলেটে করোনার জন্য ডেডিকেটেড শহীদ ডা: শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গেল ঈদুল আযহার পরও সিলেটে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেনি। বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করোনায় আক্রান্ত জটিল রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। করোনায় আক্রান্ত সাধারণ রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও এ তিনটি হাসপাতালেই আইসিইউ বেডের প্রচন্ড চাপ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত হয় গত ১ আগস্ট। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনায় মৃত্যু হয়েছিলো ১৪৬ জনের। এরপর থেকে ধীরে ধীরে এ বিভাগে মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। গত ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরো বিভাগে মৃত্যু দাঁড়ায় ১৮৮ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভাগে মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হয় আরো ৩ জনের নাম। সবমিলিয়ে মৃত্যু দাঁড়ালো ১৯১ জনে। সেই হিসেবে শুধু ঈদের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভাগজুড়ে মৃত্যু হলো ৪৫ জনের।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে ঈদুল আযহার পর গত ৩ আগস্ট ১ জন, ৫ আগস্ট ২ জন, ৬ আগস্ট ২ জন, ৭ আগস্ট ১ জন, ৮ আগস্ট ২ জন, ১২ আগস্ট ৪ জন, ১৩ আগস্ট ৪ জন, ১৫ আগস্ট ২ জন, ১৬ আগস্ট ২ জন, ২২ আগস্ট ২ জন, ২৬ আগস্ট ২ জন, ১ সেপ্টেম্বর ৩ জন, ২ সেপ্টেম্বর ১ জন এবং ৩ সেপ্টেম্বর ৩ জনের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেট-এর সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, ‘সিলেটে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক ব্যবহার করছে না। সচেতনতার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, জেলা শহরগুলোতে মানুষের ভিড় থাকে বেশী। উপজেলার চেয়ে জেলা শহরগুলোতে মানুষ কম মাস্ক ব্যবহার করে। জেলা সচেতন হলে উপজেলাগুলোও সচেনতার আওতায় সহজে চলে আসতো বলে জানান তিনি। ট্রাফিক সপ্তাহের মতো প্রতি সপ্তাহে প্রতি পয়েন্টে মাস্কের ব্যাপারে অভিযান চালানো গেলে হয়তো কিছু পরিবর্তন আসতো বলে মন্তব্য এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিলেট বিভাগে যে হারে আক্রান্ত এবং মৃত্যু বাড়ছে-সেই হারে সচেতনতা বাড়ছে না। যার মাশুল আমরা দিচ্ছি, সচেতন না হলে আরো মাশুল দিতে হবে’ বলে মন্তব্য তার।
চিকিৎসক তায়েফ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থা খুবই খারাপ। মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যার দিক দিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ ছাড়িয়ে গেছে। গোটা বিশ্বের চেয়ে বেশী আক্রান্ত এবং মৃত্যুর দেশ এখন ভারত। ভারতের অবস্থা ভয়াবহ হলে আমাদের ভালো থাকাটা অনিশ্চিত। এই বাস্তবতায় আমাদের দেশ এখনো অনেক ভালো আছে। এই অবস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন অধিক সচেতনতা।’
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘ মানুষ যতক্ষণ মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু কমবে না। এরই মধ্যে অনেক দেশ দ্বিতীয় দফায় সংক্রমিত হচ্ছে। তিনি বলেন, সিলেটতো পৃথিবীরই একটি দেশ। সারা পৃথিবীর মানুষ যদি সচেতন হয়, আমরা কেন হবো না।’
সিলেট ওসমানী হাসপাতালের চিকিৎসক মো. মুখলিছুর রহমান বলেন, মানুষের নিজের ভালমন্দ নিজেকেই বুঝতে হবে। মাস্কের উপকারিতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, করোনা ছাড়াও সবসময় এটি ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো। দূষণ রোধে মাস্কের উপকারিতা অপরিসীম।
ফুটপাতের মাস্ক বিক্রেতা আমির হোসেন জানান, ‘আগের মতো এখন মাস্ক বিক্রি হয় না। তিন ভাগের দুইভাগ মানুষ মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছে। অথচ আগের চেয়ে এখন মাস্কের দাম অনেক কমেছে।’
জিন্দাবাজার রাজা ম্যানশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন চল্লিশোর্ধ্ব রিকসাচালক বেলাল মিয়া। মুখে মাস্ক নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ’কেউই মাস্ক পড়ে না। যাত্রীরা যদি বলতো মাস্ক ছাড়া আমরা রিকসায় উঠবো না, তাহলে আমরাও বাধ্য হতাম মাস্ক পরতে।’