১২ আগস্ট ২০২০
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ছিলেন কম্পিউটার প্রশিক্ষক। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিরতিহীনভাবে রাত ৯টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রশিক্ষণক্লান্ত এ অবস্থাটি মারাত্মক প্রভাব ফেলতে থাকে তার দুই চোখে। মনিটরের ক্রমাগত চাপে দৃষ্টিতে ক্ষতির শঙ্কা দেখা দেয়। তিনি খুঁজতে থাকেন পরিত্রাণের পথ। পরে গণমাধ্যমে কৃষিজাত প্রতিবেদনগুলো দেখে অর্জন করেন দারুণ অনুপ্রেরণা। অবশেষে ঘটনাক্রমে হলেন কৃষক। এই পালাবদলের ঘটনা শারীরিক সমস্যাজনিত হলেও এখন শ্রীমঙ্গল উপজেলায় একজন সফল কৃষক মো. আব্দুল মুহিত মুরাদ।
এলাকায় এখন তিনি একজন কৃষিজাতপণ্যের উদ্যোক্তা হিসেবে অনেকের কাছেই অনুকরণীয়। দুই হাজার সালে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম পেঁপে চাষে এসেই হয়েছেন ব্যর্থ। ভেঙে যায় মন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয় ধাপে লাগিয়েছে আম। ৩শ টাকা করে যশোর থেকে সুরমাইয়া ফজলি, ফজলি, ল্যাংড়া, কাচা মিঠা, আম্রপালি, সুবর্ণরেখা, মুম্বাইবুট, আশ্বিনা প্রভৃতি ১০ জাতের আমের চারা লাগিয়েছিলেন। তারপর আসে প্রচুর ফল। দারুণ উৎসাহ লাভ করেন।
আব্দুল মুহিত মুরাদের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সাড়ে ১৪ কিয়ার (বিঘা) জমিতে তিনি মাল্টা ছাড়াও কমলা, জাম্বুরা, পেয়ারা, আম, আমড়া, লিচু, কচু প্রভৃতি নানান জাতে ফলস উৎপাদন করেছেন।
মো. আব্দুল মুহিত মুরাদ বলেন, আমি এখন মাল্টা চাষে সফলতা পেলেও শুরুটা ছিল কিন্তু তৃতীয় ধাপে ২ জাতের আলু দিয়ে। ২০১০ সালের দিকে প্রথমে ললিতা বা ডায়মন্ড জাতের আলু চাষ করেও সাফল্য আসেনি। পোকায় সব আলু নষ্ট করে দিয়েছিল। পরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) তৎকালীন উপ-পরিচালক সুপ্রিয়ের পরামর্শ এবং সহযোগিতায় মোট আড়াই কিয়ার (বিঘা) জমিতে ডায়মন্ড এবং স্টেরিক দুই জাতের আলু রোপণ করি। প্রচুর সাফল্য আসে। ২০ শতাংশ জমিতে লাগানো আলুর একটা জাতে প্রায় ৬০ মণ আলু পাই।
মাল্টা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার এখানের ২৪ শতক জমিতে ‘বারি মাল্টা-১’ জাতের মাল্টা চাষ করেছি। স্থানীয় কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রায় ১২০টা চারা। বড় সাইজের মাল্টার গাছগুলোতে ফল কম আসে, কিন্তু অপেক্ষাকৃত মাঝারি সাইজের গাছগুলোতে বেশি মাল্টা ধরে। এ পর্যন্ত মাল্টা চাষে বিভিন্নভাবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
এক গাছে প্রায় একশ’ মাল্টা ধরেছিল, কিন্তু টিকেছে ৮৪টা। এক বছর লাগে একটি মাল্টা গাছ প্রাপ্তবয়স্ক হতে। আমি প্রথম দুই-তিন বছর আমার উৎপাদিত পণ্যগুলো আমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দেই। এরপর থেকে আমার চাষকৃত ফলগুলো আমি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির চিন্তা-ভাবনা করবো বলেও জানান আব্দুল মুহিত মুরাদ।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রথীন্দ্র দেব বলেন, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত একটি উন্নত জাতের ফল ‘বারি-মাল্টা-১’। এ জাতের পাকা ফল দেখতে সবুজ ও খেতে সুস্বাদু। এটি আমাদের কৃষি অফিসের সহযোগিতায় মুরাদের এখানে মোট ১২০টি গাছ লাগানো হয়েছে। ৬০টি গাছের বয়স তিন বছর এবং অপর ৬০টির বয়স দুই বছর। সবমিলিয়ে প্রায় ৭শ’র মতো মাল্টা রয়েছে তার। প্রতিটি মাল্টার কেজিপ্রতি মূল্য একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা। এই ফলটি গোলাকার ও দেড়শ’ থেকে দুশো’ গ্রামের মাঝারি আকৃতির হয়ে থাকে।
পানিসহিষ্ণু হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মাল্টা গাছকে পানিসহিষ্ণুসহ শক্তিসবল করার জন্য মাটির সঙ্গে জাম্বুরা চারা রোপণ করতে হয়। কাঙ্ক্ষিত মাতৃগাছ থেকে মাল্টা অথবা কমলার ডাল সংগ্রহ করা করে জাম্বুরা গাছের যে নিচের অংশের সঙ্গে গ্রাফটিং (জোড়কলম) করা হয়। জাম্বুরা যেটা সেটাকে বলা হয় (Stok) আর মাল্টার ডালের অংশটাকে বলা হয় (Sayon)। কাঙ্ক্ষিত মাতৃগাছের গুণাগুণ বজায় থাকে এখানে।
বারি মাল্টা-১ চেনার অন্যতম সহজ উপায়, এই সবুজ ফলটির নিচে পয়সার মতো একটি গোলাকার দাগ স্পষ্টভাবে ভেসে থাকে বলে জানান উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রথীন্দ্র।