২১ জুলাই ২০২০
নিজস্ব প্রতিবেদক : দ্বিতীয় দফার বন্যার পানি বাড়িঘর থেকে নামার আগে তৃতীয় দফা বন্যার কবলে পড়েছেন সিলেট সুনামগঞ্জের মানুষ। ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম,মেঘালয়, চেরাপুঞ্জি,শিলং ও দার্জিলিংয়ে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ায়, পাহাড়ি ঢলে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি আবার বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সিলেট-সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা কবলিত এলাকার বন্যায় ডুবে যাওয়া ঘরছাড়া মানুষ বাড়িতে আসার আগেই ফের বন্যা দেখা দিয়েছে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ফের বাড়িঘরে পানি উঠা শুরু হয়েছে। লাগাতার দু’দফা বন্যার পর তৃতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গত দু’ বন্যায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে, ভেসে গেছে মাছের ঘের, সবজি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে, গবাদি পশুর খাদ্য জোগাড়ে মানুষ পড়েছেন বিপাকে ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর ও ভারত আবহাওয়া অধিদফতরের গাণিতিক আবহাওয়া মডেলের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টায় দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের হিমালয় পাদ দেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে উত্তরপূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদী সমূহের পানি সমতল দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
গত রোববার সকাল ৯টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় সুনামগঞ্জ ১৯০ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ৩২৬ মিলিমিটার, শিলংয়ে ৫৮ মিলিমিটার ও দার্জিলিংয়ে ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এছাড়া সিলেট আবহাওয়া অফিস আবহাওয়া বার্তায় জানায়, গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় সিলেট শহরে ১৪.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থায় বলা হয়েছে, মৌসুমী বায়ুর অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, হিমালয়ের পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে। দেশের ওপর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব রয়েছে। এতে সারাদেশেই বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে সিলেটসহ পাঁচ বিভাগে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নদ-নদীর পানিপ্রবাহ পরিমাপ তথ্য থেকে জানা যায়, সিলেটে কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্চ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমার পানি বিপদসীমার ৫৮ সে.মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আমাদের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে গত ২৬ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত প্রথম দফা বন্যা হয়। বন্যায় জেলা শহর ও ছাতক, দোয়ারাসহ কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ওই বন্যায় রাস্তাঘাট, মৎস্য খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরে ৯ জুলাইকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ফের দ্বিতীয় দফা বন্যা হয়। এই বন্যায় প্রায় ১ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুই বন্যার ক্ষত না শুকাতেই আবারও তৃতীয় দফা বন্যার মুখে এখন হাওর জনপদ সুনামগঞ্জ। দ্বিতীয় দফা বন্যার পানি কিছুটা কমলেও এখনো নি¤œাঞ্চল থেকে পানি পুরোদমে সরেনি। এই অবস্থায় তৃতীয় দফা বন্যায় আরো ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, আমাদের বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র পূর্বাভাস দিয়েছিল ২০ জুলাইয়ের পর ৩-৪ দিন উত্তরপূর্বাঞ্চলে আবারও বন্যা হতে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বর্ষণ ও সুনামগঞ্জের বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতি আবারও সৃষ্টি হতে পারে। কারণ সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, জেলার ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভা ও ৮৭টি ইউনিয়নের পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৩২৪টি। এসব পরিবারের মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৮ হাজার ১২৯ জন। সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি জানান, গোয়াইনঘাট ৪র্থ দফা বন্যায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পুনারায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে। গত দুইদিনের পাহাড়ি ঢলে সারী ও পিয়াইন নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে উপজেলার সবকটি ইউনিয়নেরর নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে সবগুলো ফিসারীর মাছ পানিতে পুনরায় ভেসে গেছে। অনেক ঘরবাড়িতে পানি উঠে গেছে। এছাড়া সারী-গোয়াইনঘাট সড়ক, গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়ক ও গোয়াইনঘাট জাফলং সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠেছে। এতে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে।
পুর্ব জাফলং ইউনিয়নের জাফলং চা বাগান, বাউরবাগ হাইর, আসামপাড়া হাওর, পুর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের খাষ, দাড়াইল, বাংলাইন ও লাতু হাওর, পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের সাতাইন, পাঁচপাড়া, পুকাশ, নাইন্দা, বৃধিগাঁও, তিতকুল্লি হাওরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওর এবং গ্রামম প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ ছোট বড় ও নীচু কাঁচা এবং পাকা সকল রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। রোববার ও সোমবার ভোর থেকে সারী ও পিয়াইন নদীতে বিপদসীমার উপরে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানান, উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সারী ও পিয়াইন নদী দিয়ে বিপদসীমার উপরে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে।
আমাদের ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ছাতকে ৩য় বারের মতো বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো উপজেলার জনজীবন। একদিকে মহামারি করোনা, অপরদিকে বন্যা-এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নই বন্যা কবলিত। ছাতকে সুরমা নদী বিপদ সীমার ১১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলার পিয়াইন, চেলা,বটের খাল,বোকা,ডাউকি নদীসহ সবকটি নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট , সুনামগঞ্জসহ সারা দেশের সাথে ছাতকের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আবারো বিচ্ছিন্ন হবার আশংকা রয়েছে।
উপজেলার ছোট বড় অধিকাংশ রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। ছাতক শহরসহ উপজেলার অনেক হাট বাজার ও ঘর বাড়িতে পানি উঠে পড়েছে। ইউ,এন,ও মো গোলাম কবির জানান, কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আমাদের দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গত দু’দিনের অব্যাহত ভারি বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দ্রুত পানি বৃদ্ধিতে আবারও হতাশায় ভূগছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার মানুষ। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে ফসলসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংকায় উৎকন্ঠায় রয়েছেন হাওরপাড়ের বানভাসি লোকজন। পরপর দু’দফা বন্যার ক্ষত না শুকাতেই আবারও তৃতীয় দফা বন্যার অশনি সংকেত। উপর্যুপরি বন্যায় তিন সপ্তাহকাল ধরে বীজতলাসহ ফসলি জমি পানির নিচে থাকায় রোপা আমনসহ আগামি মওসুমি ফসল উৎপাদন অনিশ্চিত ভেবে পরিবার পরিজন ও গবাদি পশুর ভাগ্য বিড়ম্বনা নিয়ে শংকিত হাজার হাজার কৃষিজীবী পরিবার।
এদিকে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে চাল-ডাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধপত্র, ঢেউটিন ও নগদ অর্থসহ বিতরণকৃত ত্রান অপ্রতুল বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গত ৪৮ ঘন্টায় দুই ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুরমাসহ উপজেলার সকল নদনদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সীমান্ত ঘেষা বগুলা, সুরমা, লক্ষীপুর, বাংলাবাজার ও নরসিংপুর ইউনিয়নসহ নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়তে থাকায় নেমে যাওয়া অনেক বাড়িঘরে আবারও পানি প্রবেশ করেছে। ফলে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে জনজীবনে। হাওর, খাল-বিল, মাঠঘাটে আবারও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকালয়ে আবারও পানি ঢুকছে।
আমাদের জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, রোববার মধ্যরাত থেকে গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতে ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নদ, নদী এবং হাওরগুলোতে পানি বেড়েছে। ফলে তৃতীয় দফা বন্যায় দূর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার লাখো মানুষ।
নলুয়া হাওরপাড়ের দাসনাগাও গ্রামের ইউপি সদস্য রনধীর কান্ত দাস গতকাল দুপুরে জানান, টানা বৃষ্টিপাতে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভোররাত থেকে পানি বেড়েছে। এর মধ্যে দুই দফা বন্যার পানিতে দুর্ভোগে পড়া লোকজন বসতবাড়িতে ফিরলে ফের বন্যার শঙ্কায় আবার আশ্রয় কেন্দ্র খুঁজছে মানুষ।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া বলেন, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আগেই আবারও বন্যার শঙ্কায় শঙ্কিত হাওরাঞ্চলের মানুষ। তিনি জানান, এখনও গ্রামীন রাস্তা-ঘাট, বসতবাড়ি ঘরের চারপাশে পানি রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে পানি বাড়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন লোকজন।
কলকলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল হাসিম জানান, গত তিন-চার দিনে লোকজনের বসতঘর থেকে বন্যার পানি কমলেও আমাদের ইউনিয়নে এখনও ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি। এরমধ্যে ভারী বর্ষণ ও ঢলে গতকাল পানি বেড়েছে। ফের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ইয়াসির আরাফাত বলেন, আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।