১২ জুলাই ২০২০


দক্ষিণ সুনামগঞ্জে শঙ্কা নিয়ে বন্যা প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ

শেয়ার করুন

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ: দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। হাওরিয়া জেলা সুনামগঞ্জে ‘হাওরের উঠান’ নামে পরিচিত একটি উপজেলা। হাওরের সাথে জীবন মিশিয়ে জিবীকার সন্ধান করে প্রতিদিন বাঁচে এখানকার মানুষ। দু’সপ্তাহ আগের আকস্মিক বন্যায় পানি বন্দি হয়ে পড়েছিলো এ উপজেলার শতাধিক গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। কোনও কিছু বুঝে উঠবার আগেই তলিয়ে গিয়েছিলো রাস্তাঘাট, গরুর গোয়ালা, খড়ের ঘর, হাঁস-মুরগির খামার, বসতঘরসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
 
কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ বন্যায় শিক্ষায় কোনও প্রভাব ফেলতে না পারলেও ভিটে ছাড়া করেছিলো উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের কয়েকশ পরিবারকে। নিজেদের ভিটা ছেড়ে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন উঁচুভিটায় থাকা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আকস্মিক আসা এ পানি কমতে শুরু করলে সপ্তাহখানেক পরে শঙ্কা কাটিয়ে নিজেদের বাড়ি ফিরতে শুরু করেন অন্যের বাড়িতে থাকা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা। আর যারা বন্যার পানি মাড়িয়ে নিজেদের ঘরেই ছিলেন তারা শুরু করেন ঘরদোর ঠিক করার কাজ। তবে হাওর নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় দুঃশ্চিন্তা আর পিচু ছাড়েনি দক্ষিণ সুনামগঞ্জবাসীর।
 
গত বৃহস্পতিবার থেকে ক্রমাগত বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে হাওর ও নদীর পানি। এতে ভেসে উঠা রাস্তাঘাটগুলো আবারো তলিয়ে যাচ্ছে।
 
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছে আগাম সতর্কবার্তা। ফলে ঘরমুখী মানুষগুলোর আর ঘরে ফেরা হচ্ছে না। যারা নতুন আশায় ঘরে ফিরেছিলেন তারা আবারও ফিরছের আশ্রিত জায়গায়। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত টানা বৃষ্টি, পরদিন সারাদিন প্রতিকূল আবহাওয়া ও দক্ষিণা বাতাস এবং শনিবার দিনরাত অবিরাম বৃষ্টিতে দ্বিতীয়বারের মত রীতিমত ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সে শঙ্কাকে আরও জোড়ালো করেছে। আর সে অনুপাতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিও শুরু করেছেন অনেকে। কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠাচ্ছেন গৃহপালিত প্রাণিদের, কেউ ছুটছেন নিকস্থ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় আশ্রয়ের স্থান নির্ধারণের জন্য। অনেকে গুচাচ্ছেন ঘরের আসবাবপত্র। রাস্তা পারাপারের জন্য কেউ কেউ আবার নৌকাও ক্রয় করছেন। কপাল ভাঁজ করা এমন প্রস্তুতি যে মোটেও আশা করেননি এ উপজেলার মানুষ তাদের কথাতেই তা বুঝা যায়।
 
এমন বৈপরিত্য অবস্থা নিয়ে কথা হয় উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের আসামমুরা (বিলপাড়) গ্রামের বাসিন্দা আজব আলীর সাথে। তিনি জানান, ‘আমাদের আর জিজ্ঞেস করে কি লাভ? আমরা তো এ বছর বরাবরই বিষাক্ত। করোনা ভাইরাসের কারণে ঘর থেকে বের হতে পারিনি। এর পর পরই বন্যা। বন্যায় তো আরও বেশি ঝামেলায় ফেলে দিলো। ঘরবাড়ি পানিতে দুইবার ডুবলো। মুরগি ছিলো ১০-১২টি। গত বাজারে বিক্রি করে দিয়েছি। গরু তো আর বেচতে পারি না। গরুই আমাদের সম্পদ। নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে রেখেছি। আমরাও আশ্রয় নিয়েছি একটি স্কুলে।’
 
এই কথার সাথেই সুর মিলান পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কৃষক ইউসুফ আলী। ৩টি গরু তার। ৫টি মুরগি ছিলো। মরতে মরতে আছে ১টি । গরুগুলোকে তার বাড়ির পাশে একটি প্রাইমারি স্কুলে নিয়ে রেখেছেন। গোয়াল ঘরে আগের পানিই নামেনি। আবার পানি চলে আসায় চিন্তিত তিনিও।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেবুন নাহার শাম্মী বলেন, ‘বন্যা কবলিতদের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কাছে এতাদিন খাদ্য খুবই কম ছিলো। আজ আরো বেশ কিছু খাদ্য পেয়েছি। বন্যা কবলিতদের বাড়ি বাড়ি খাদ্য পৌছে দেবো আমরা। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে একটা ধারণা নিয়েছি। কাল থেকে উপজেলায় আমরা বিতরণ কাজ শুরু করবো।’ ইউএনও আরও বলেন, ‘যারা ইতোমধ্যে বাড়ি ছেড়ে নিকস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন তাদেরকে অগ্রাধিকার দিয়েই আমরা কাজ করবো।’
 
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক নূর হোসেন বলেন, ‘বন্যার জন্য এখনো আমাদের কাছে কোনো বরাদ্দ এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে পরিষদ বসে দ্রুত মানুষের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে আসবো।’ তারা বলেন, ‘ভিত্তবানরা এখন এগিয়ে আসার সময়। উপজেলাবাসী খুবই সতর্ক থাকবেন। চুর, ডাকাতের উপদ্রব বাড়তে পারে। ছোট ছোট শিশুদের হাতের নাগলে রাখবেন সব সময়।

শেয়ার করুন