২ ফেব্রুয়ারি ২০২০
আহমাদ সেলিম, অতিথি প্রতিবেদক : নান্টু কুরি একজন ব্যবসায়ী। পরিবার নিয়ে বসবাস করেন নগরীর মাছিমপুর এলাকায়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শাহী ঈদগাহ থেকে কাজিটুলা হয়ে বাসায় ফিরছিলেন মোটর সাইকেল যোগে। কাজিটুলা মসজিদের পাশে আসামাত্রা বেপরোয়া একটি পাথরবোঝাই ট্রাক তাকে ধাক্কা দেয়। তারপর তার জীবন থমকে দাঁড়ায়। তিনি পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নান্টু কুরি ছাড়াও জানুয়ারি মাসে নগরীতে শুধু ট্রাক দুর্ঘটনায় ছয়জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। এসব ঘটনায় অধিকাংশ চালক পালিয়ে যান। যারা আটক হন তারা নিহতদের পরিবারের চোখের জল মুছার আগেই জামিন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
অপরদিকে, অধিকাংশ ট্রাক দুর্ঘটনার পর মামলা হয় না। ফলে সহজে পার পেয়ে যায় চালকরা। এই অবস্থায় নগরীতে ট্রাক চলাচল বন্ধের দাবিতে কয়েক দফায় আন্দোলন করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মিলেনি। তাই স্থানীয়রা আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
আম্বরখানা এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাট্য ব্যক্তিত্ব আফজাল হোসেন জানান, ‘ট্রাক চলাচলের জন্য নগরীর মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কের সড়ক এখন আম্বরখানা। তিনি বলেন, দুই মাস আগে ট্রাকের ধাক্কায় ওই এলাকায় তার মেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন রাতের বেলা এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে ভয় হয়। শুধু রাতে নয় আম্বরখানা এলাকায় দিনেরবেলাও ট্রাক চলাচল করে-অভিযোগ করেন তিনি।
আম্বরখানা মেরী স্টোপস’র প্রোগ্রাম অফিসার মোহন লাল দাস মৃদুল বলেন, ‘আম্বরখানা এলাকায় ট্রাক দুর্ঘটনা নিয়মিত হয়ে গেছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দিনদুপুরে ট্রাকের ধাক্কায় এক রিকসা চালক নিহত হন। তার আগে পাঠানটুলায় একইস্থানে ট্রাকের ধাক্কায় এক পথচারী প্রাণ হারান। এভাবে গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি হতাহতের ঘটনা ঘটে এ সড়কে। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যাচ্ছে না। এরপরও নগরীর ভেতর দিয়ে দিব্যি চলাফেরা করছে ট্রাক।
নগরীতে ট্রাক চলাচল বন্ধের দাবিতে গত ২৫ জানুয়ারি রাতে আম্বরখানা, চৌহাট্টা এলাকায় আন্দোলনে নামেন সর্বস্তরের মানুষ। এর আগেও ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর নগরীর ভেতর দিয়ে ট্রাক চলাচল বন্ধের দাবিতে কয়েক দফায় আন্দোলন করেছেন সর্বস্তরের মানুষ। এত আন্দোলন, সচেতন মহলের উদ্বেগ, সংশ্লিষ্ট মহলের আশ্বাসের পরও নগরীতে ট্রাকের নৈরাজ্য চলছেই। কারও না কারও রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ।
আম্বরখানা বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক গুলজার আহমদ বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছি। কোনো লাভ হচ্ছে না। এখন বাকি পথে নামা। আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে রাস্তায় নামবো। তিনি বলেন, রাত দশটার পর থেকে এবং ভোর ছয়টার মধ্যে ট্রাক চলাচলেরও অনুরোধ করেছি। কিন্তু বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না কেউ।’
রাত ৮টার পর নগরে ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও কিছু ট্রাক সন্ধ্যার পর থেকে প্রবেশ শুরু করে। আর রাতের আঁধারে নগরের সড়কে বেপোরোয়া গতিতে ট্রাক চলাচলের কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে।
ট্রাক দুর্ঘটনায় ডান পা হারা নান্টু কুরি বলেন, ‘আমার জীবনটা অর্ধেক করে দিলো একটি দুর্ঘটনা। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। কিন্তু, আমি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় ট্রাক চালক জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। আমার মতো যেন আর কারো জীবন এমন না হয়।
তিনি বলেন, ট্রাক সব সময় বেপরোয়া। শহরের মধ্যে প্রবেশের জন্য তাদেরকে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এজন্য তাদের মধ্যে সবসময় একটা তাড়া থাকে। আর সেই তাড়া থেকে চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। এজন্য নগরীর ভেতর দিয়ে ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সনাক) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘রাত আটটার আগেই শহরে যখন ট্রাক প্রবেশ করে তখন মানুষের ঘরে ফেরার ব্যস্ততা থাকে। বিশেষ করে চাকুরিজীবীরা এ সময়টা বাড়ি ফিরেন। ব্যস্ততম এ সময়টায় ট্রাক শহরে প্রবেশ করার ফলে প্রচন্ড যানজট থাকে আম্বরখানা এলাকায়। তখন শহর থেকে বের হবার জন্য চালকদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে। এদের জন্য বিকল্প বাইপাস সড়ক দরকার।’
সিলেট ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আবু সরকার রাত আটটার মধ্যে নগরীতে ট্রাক প্রবেশের বিষয়টি মানতে নারাজ। তবে, কিছু ট্রাক সময়ের পূর্বে নগরীর ভেতরে প্রবেশের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। অবশ্য এর জন্য তিনি ট্রাফিক পুলিশের কিছু ‘অসাধু কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, এসব পুলিশের সাথে আঁতাত করে তারা নিয়ম ভঙ্গ করছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের দিকে যে বাইপাস সড়ক রয়েছে-সেদিকে অন্তত খালি ট্রাকগুলো যাতায়াত করলে নগরীর ভেতর যানজট প্রকট হতো না। বিষয়টি নিয়ে আমরা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাথেও কথা বলেছি।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, নগরীর ভেতর দিয়ে ট্রাক চলাচলের পক্ষে নই আমরাও। বিষয়টি নিয়ে অতীতে আমি বহুবার সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে কথা বলেছি। সরকারও উদ্যোগ নিয়েছিলো বিমানবন্দর বাইপাস সড়কের জন্য। কিন্তু, সেটি আলোর মুখ দেখছে না। কতোয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) রীতা বলেন, জানুয়ারি মাসে চৌহাট্টা এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় শুধু ইমতিয়াজ মাহবুব মির্জা (২০) মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। আর কোনো মৃত্যুর খবর তাদের জানা নেই।
মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক এডিসি নিকোলিন চাকমা জানান, রাত আটটায় তেমুখী বাইপাস এবং রাত নয়টায় কোম্পানীগঞ্জ বাইপাস থেকে ট্রাক ছাড়া হয়। তারপরও কিছু ট্রাক সময়ের আগে প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে পদ্মা সেতুসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মালমাল বহনকারী ট্রাকগুলোকে আমরা আগে ছেড়ে দেই। তবে অসাধু পুলিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।
সম্প্রতি সিলেটে এক মতবিনিময় সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, এয়ারপোর্ট টু তেমুখী বাইপাস নির্মাণের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
নগরীতে সড়কে প্রাণ ঝরলো যাদের
পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে সুবিদবাজারস্থ রিফাত এন্ড কোম্পানির সামনে দ্রুতগামী একটি ট্রাকের ধাক্কায় তানিয়া বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হন। এর কিছু সময় পর তিনি সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তানিয়া নগরের চৌকিদেখি এলাকার ৪৩/১ নুরজাহান ভিলার আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তানিয়া চৌকিদেখির বাসায় যাওয়ার জন্য রিক্সায় উঠেছিলেন। সুবিদবাজারের রিফাত এন্ড কোম্পানির সামনে আসার পর পেছন থেকে একটি ট্রাক ওই রিক্সাকে ধাক্কা দিলে তানিয়া ছিটকে পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মারা যান।
২১ জানুয়ারি নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় ইমতিয়াজ মাহবুব মির্জা (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ওইদিন দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওইদিন জিন্দাবাজারে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষে ইমতিয়াজ ও তার বন্ধু শহরতলীর বালুচর কনের বাড়িতে যান। সেখান থেকে মোটরসাইকেল যোগে বাসায় ফেরার পথে চৌহাট্টা পয়েন্টে আসামাত্র জিন্দাবাজার থেকে আম্বরখানার দিকে আসা দ্রুতগামী একটি ট্রাক তাদের মোটরসাইকেল ধাক্কা দেয়। এতে রাস্তায় ছিটকে পড়ে ইমতিয়াজের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হন তার সহযোগী ২জন।
এর আগে ২০ ডিসেম্বর আম্বরখানায় বেপরোয়া ট্রাক চাপায় ২ ছাত্রলীগ নেতা গুরুতর আহত হন। আহতরা ১০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি ও সিলেট সরকারি কলেজের ছাত্র আকাশ ঘোষ (২২) ও সিলেট মদনমোহন কলেজের ছাত্রলীগ নেতা আরিয়ান খান তালহা (১৯)। গত ২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার পর এ ঘটনা ঘটে।
একইভাবে ৩০ আগস্ট রাত ১১টার দিকে নগরের নাইওরপুল পয়েন্টে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান মোহন নামে এক তরুণ। এর আগে কোম্পানীগঞ্জ সড়কে নগরীর আম্বরখানায় পাথরবাহী ট্রাকের চাপায় ঘটনাস্থলেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক শাহ আলম (২১) ও খায়রুল ইসলাম (২৪) নামে এক যাত্রী নিহত হন।
এছাড়া, ২০১৯ সালেও নগরীর ভেতর বেশ কয়েকটি ট্রাক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। ২০১৯ সালের ২২ মার্চ আম্বরখানা পয়েন্টে একটি ট্রাক কেড়ে নেয় দেবাশীষ দে পিনাকের জীবন। তিনি ছিলেন মিরাবাজার বলরাম আখড়া এলাকার বাসিন্দা এবং আম্বরখানা সিলসিলার ম্যানেজার।
দেবাশীষ দে পিনাকের সমন্ধি আম্বরখানা কলোনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গণেশ পাল দিপু বলেন, ‘নির্মম সেই ঘটনাটি এখনো চোখে ভাসে। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘নগরী দিয়ে ট্রাক চলাচল বন্ধ না করলে এভাবে অকালে আরো অনেককে জীবন দিতে হবে। একটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবার অসহায় হয়ে সারাজীবন চোখের পানি ফেলবে।’