৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২
আহমাদ সেলিম (অতিথি প্রতিবেদক) : বাংলাদেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক স্থাপনা সিলেটের ক্বীনব্রীজ। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গৌরবোজ্জ্বল এই সেতু পঁচাশি বছর অতিক্রম করেছে। ব্রীজের নির্মাণশৈলী ও এর স্থায়িত্ব দেখে এখনো মুগ্ধ হন দেশের মানুষ।
ক্বীনব্রীজকে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও মডেল সেতু হিসেবে দেখেন পর্যটকরা। কিন্তু কালের স্বাক্ষী এই ক্বীনব্রীজের চারপাশে রয়েছে অযত্নের ছাপ। স্থানে স্থানে সৃষ্টি হয়েছে গর্ত। সামান্য জায়গাটুকু পার হতে কয়েকবার পড়তে হয় ঝাঁকুনির কবলে। সন্ধ্যার পর জ্বলেনা সবগুলো বাতি। বিশেষ করে রাতের বেলা দুর্ভোগ পোহাতে হয় পথচারীদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রীজটি রক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া খুবই জরুরী। কারণ, ইচ্ছে করলেই এরকম আরেকটি ব্রীজ নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
তারা বলছেন, শুধু রিকসা এবং পায়ে চলাচল করলে আরো হাজার বছর ব্রীজটি আমরা পাবো। তবে, ট্রাক এবং পিকআপ চলাচল ব্রীজের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। অন্যদিকে সৌন্দর্য রক্ষায়ও আছে সবার উদাসীনতা।
পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে সিলেটের নাম মুখে নিলেই প্রথমে চোখে ভাসে ক্বীনব্রীজ কিংবা আলী আমজদের ঘড়ির ছবি। ঐতিহাসিকভাবেই সিলেটের নামের সাথে জড়িয়ে গেছে ব্রিজটি। সিলেটের প্রবেশদ্বারে থাকা এই ক্বীন ব্রীজ দিয়ে ১৯৩৬ সাল থেকে মানুষের চলাচল শুরু হয়।
সুরমা নদীর ওপর স্থির দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিজটি পর্যটকদের জানিয়ে দেয় এ অঞ্চলের ইতিহাসের কথা। আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ব্রীজটি কালের বিবর্তনের পথ পেরিয়ে এখনো তার মহিমা ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। ক্বীনব্রীজ নামে পরিচিত এই স্থাপনার বহু কথাই ছড়িয়ে আছে ইতিহাসবিদদের মুখে মুখে। গত তিরিশের দশকের দিকে তৎকালীন আসাম প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন মাইকেল ক্বীন। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে একবার তিনি সিলেট পরিদর্শনে এলে তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এ ব্রীজটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় আসামের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ট্রেন। আর এ কারণেই এ অঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগের পথ সুগম করতে সুরমা নদীতে ব্রীজ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রেলওয়ে বিভাগ ১৯৩৩ সালে সুরমা নদীর ওপর ব্রীজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
তারপর ১৯৩৬ সালে ব্রীজটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। নতুন সেই ব্রীজের নামকরণ হয় গভর্ণর মাইকেল ক্বীনের নামে। ব্রিজের প্রধান কাঠামোটি লৌহ দিয়ে নির্মিত। এর আকৃতি অনেকটা ধনুকের ছিলার মত বাঁকানো। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট এবং প্রস্ত ১৮ ফুট। এই ব্রিজটি নির্মাণে তখনকার দিনেই ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তৎকালীন আসাম সরকারের এক্রিকিউটিভ সদস্য রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত এবং শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদ ব্রিজটি নির্মাণের ক্ষেত্র বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। ব্রীজ নির্মাণের সময় তখন যারাই এপার বাংলায় আসেন তারা ব্রীজ দেখে মুগ্ধ হতেন। ব্রীজের নান্দনিকতায় বিমোহিত হয়েছিলেন বাণিজ্যের জন্য নৌকা আর জাহাজযোগে আসা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বণিকরা। তখন নতুন ঝলমল ব্রীজের নিচ দিয়ে বয়ে চলা টুইটম্বুর সুরমা নদী ছিলো আরো গতিশীল, আরো দৃষ্টিনন্দন।
ব্রীজ নির্মাণের ৩৫ বছর পর ১৯৭১ সালে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। সে সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে ব্রিজের উত্তর পাশের একাংশ উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে কাঠ ও বেইলি পার্টস দিয়ে বিধ্বস্ত অংশটি মেরামত করা হয় এবং ব্রিজটি হালকা যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পরবর্তিতে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগিতায় ব্রিজের বিধ্বস্ত অংশটি কংক্রিট দিয়ে পুনঃনির্মাণ করা হয়। রেলওয়ের পর পর আরো কয়েক দফায় সংস্কার কাজ হয়।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনও ভুমিকা রেখেছিলো এর উন্নয়নে। এক সময় ব্রীজ রক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সেটিও বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। তবে যতই পুরনো হোক এখনও অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ব্রিজটি দেখতে ভিড় জমান দেশ-বিদেশের মানুষ। বাংলা সাহিত্যেও এই ব্রীজ নানাভাবে ওঠে এসেছে। কখনো কবিতা কখনো গল্প কিংবা নাটকে গুরুত্ব পেয়েছে ব্রীজটি।
একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমানুষের কবি দিলওয়ার এর ‘ক্বীনব্রীজে সূর্যোদয়’- বহুল পঠিত একটি কবিতা। এই কবিতাটিও কবিকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে। সিলেট শহর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদী পারাপারের এই সেতু নিয়ে কবির অভিব্যক্তি সত্যিই বিস্ময়।
উপরে সুনীল আকাশ, নিচে কলকল ধ্বনি মুখর সুরমা আর মধ্যখানে ব্রীজ।
ভোরবেলা শীতলবাতাস, পাখির কিচির মিছির শব্দ সতেজ করে মনকে। শেষ বিকেলে সূর্য বিদায় নেবার সময় লাল টকটকে হয়ে আসে চারপাশ। সারাদিনের ক্লান্তি যেন মুছে দিয়ে যায় সূর্যের শেষ আভা। সিলেটের অন্যতম কীর্তি এই ব্রীজ শহরে প্রবেশদ্বারের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছে যুগের পর যুগ। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে স্বাধীনতার পর থেকে কয়েকদফায় সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নেয়া হয় নানা পরিকল্পনা।
গ্রামীন ফোন, সিটি কর্পোরেশন রূপ লাবণ্য বাড়াতে বেশ কয়েকবার ব্রীজের পাশে দাঁড়ায়। আলো-ঝলমলে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় তারা। তবে, কোনো উদ্যোগেই দির্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ক্বীন ব্রীজের উপর নতুনভাবে স্থাপন করা হয় ২০টি পুল। পুরনো ৩২টি পুলসহ ৫৬টি এলইডি বাল্ব লাগানো হয়েছিলো। বর্তমানে বেশ কয়েকটি বাল্ব জ্বলছেনা।
দিনেরবেলা সিএনজি অটোরিকসা, রিকসা, মোটরসাইকেল চলাচল করলেও রাতে পিকআপসহ অন্যান্য মাঝারি যানবাহন অবাধে চলাচল করছে। লোহা থেকে উঠে গেছে রং। গতকাল মঙ্গলবার রাতে সরেজমিন ক্বীনব্রীজে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশে ২৮টি করে মোট ৫৬টি বাল্ব রয়েছে। তার মধ্যে একপাশে ১০টি এবং অপরপাশে ৭টি বাল্ব জ্বলছে না।
পথচারীরার জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাল্বগুলো অকেজো অবস্থায় রয়েছে। যেখানে সেখানে গর্ত থাকায় রাতের বেলা ঘটে দুর্ঘটনা।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম জানান, ‘লন্ডন আমেরিকাসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এরকম প্রাচীন স্থাপনাকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। তারা সংরক্ষণ করে রাখে। পর্যটকরা এসে দেখে, ছবি তুলে। আমাদের এত বড় একটি সম্পদকে গুরুত্বই যেন দেয়া হচ্ছেনা। রাতের বেলা সবধরণের যানবাহন ইচ্ছে মতো চলছে।
তিনি বলেন, ট্রাক কে অবশ্যই না, এমনকি পিকআপ চলাচলও ঝুকিপূর্ণ। অথচ পিকআপ চলাচল করছে। শুধু মানুষ কিংবা রিকসা চলাচল করলে এই ব্রীজটিকে আরো হাজার বছর আমরা টিকিয়ে রাখতে পারবো।’
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, আমরা কয়েকবার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েও পারিনি। তবে, আমরা বিষয়টি নিয়ে বসবো। বাল্ব, সড়কের গর্তসহ অন্য সমস্যাগুলো সমাধান হবে খুব তাড়াতাড়ি।