২৫ ডিসেম্বর ২০১৯
বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথের পুনর্বাসন প্রকল্পের পূর্ব নির্ধারিত মেয়াদের সাথে আরো ৬ মাস সময় বর্ধিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ রেলপথের পুনঃনির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। গত ২ মাস ধরে কাজের গতি কিছুটা বাড়ানো হলেও বর্ধিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলে শংকা রয়েছে। যদিও রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারবে বলে দাবী করছে।
২০১৮ সালের মে মাসে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলওয়ে পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কাজ শুরুর দেড় বছরে মাত্র ১৪-১৫ ভাগ সম্পন্ন হওয়ায় গত অক্টোবরে নতুন করে প্রকল্পের কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয় আরও ছয়মাস। সে অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শেষ হবে। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির পর নির্মাণ কাজের কিছুটা গতি বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেলেও এলাকাবাসী আশংকা করছেন নির্ধারিত সময়ে কোনভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
সরেজমিনে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলওয়ে পুনর্বাসন প্রকল্প পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, পুরনো রেল সরিয়ে ফেলার পর মুল রেলপথের ওপর মাটি ফেলে রুলিংয়ের সাথে লাইনের সাপোর্টিংয়ের জন্য উভয় পাশও রুলিং করা হচ্ছে। পুরনো সেতু ও কালভার্ট ভেঙ্গে সেখানে পাইলিং ও ঢালাইয়ের কাজ চলছে। কয়েকটি নতুন স্টেশন ঘর ও ইয়ার্ড তৈরীর কাজ চলছে।
দক্ষিণভাগ কাঠালতলী, শাহবাজপুর স্টেশন এলাকা ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন এলাকার কিছু স্থানে রেলপথ উঁচু করার জন্য মাটি, পাথর, রেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী এনে মজুদ করা হচ্ছে। উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের সমাজসেবক রফিক উদ্দিন, রহিম উদ্দিন ও আব্দুর রহমান বাবুল, সুলতান মাহমুদ জানান, নির্ধারিত সময়ে রেলপথ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে হলে যে হারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করার কথা সেভাবে কাজ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অবশ্যই আরো সময় বাড়াবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৮৫ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসেবে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন চালু হয়েছিলো। রেলপথটির দৈর্ঘ্য ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার। বড়লেখা উপজেলার লাতু সীমান্ত দিয়ে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন হয়ে আসাম রেলওয়ের ট্রেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করতো। স্বাধীনতা পরবর্তী কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনে চলাচলকারী একমাত্র ট্রেনটি এলাকাবাসীর কাছে ‘লাতুর ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল।
রেললাইনটি চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়ায় তা সংস্কার না করেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২০০২ সালের ৭ জুলাই ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া এলাকা এবং বিয়ানীবাজারের একাংশের লোকজন দুর্ভোগের শিকার হন। ট্রেন বন্ধের প্রভাব পড়ে দ্রব্যমূল্য, সড়ক পথের যাতায়াত ভাড়া ও স্থানীয় শ্রম বাজারে। এরপর লাইনটি চালু করার জন্য নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করেন সর্বস্তরের জনসাধারণ।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২৬ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনঃস্থাপন প্রকল্প অনুমোদন পায়। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ভারত সরকার ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা দেবে। ৪৪ দশমিক ৭৭ কিলোমিটারের পুরোটাই ডুয়েলগেজ লাইন করা হবে। এরমধ্যে ৭ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার লুপ লাইনের কাজ হবে। ওই বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদির বাংলাদেশ সফরকালে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
ভারতের দিল্লির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘কালিন্দি রেল নির্মাণ’ দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ পায়। প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে ভারতের ‘বালাজি রেল রোড সিস্টেমস’।
কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথে ৫টি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। স্টেশনগুলো হলো জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঠালতলী, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর। পুরো রেলপথটি ডুয়েল গেজের হবে বলে রেলওয়ে সুত্র জানিয়েছে।
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (কার্য) মো. জুয়েল হোসেন জানান, প্রকল্পের কাজের ধীর গতির কারণে গত অক্টোবরে চুক্তির মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়। এর আগে বর্ষা মৌসুমের জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ আগাতে পারেনি। এখন কাজের গতি অনেকটা বেড়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেলপথের মাটির কাজ প্রায় সম্পন্ন করতে চলেছে। পাথর ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীও সাইটে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণভাগ, শাহবাজপুর ও মুড়াউল স্টেশন বিল্ডিংয়ের ও দক্ষিণভাগ স্টেশনের ইয়ার্ড নির্মাণের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বড় কাজগুলো সম্পন্ন হবে বলে তার আশা।