৬ অক্টোবর ২০১৯
উপজেলা প্রতিনিধি

বিশ্বনাথ : সংযোগ সড়ক না থাকায় প্রায় দু’যুগ ধরে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার মাটিজুড়া নদীর উপর নির্মিত দুই সেতুর একটি ব্যবহার করেতে পারছেন না এলাকাবাসী, আর আরেকটি রয়েছে অর্ধনির্মিত অবস্থায়। ১৯৯৮ সালে সেতু দুটির নির্মাণ কাজ করা হলেও তা সর্বসাধারণের কোন উপকারে আসছে না। ফলে প্রায় দুই যুগ ধরে মাটিজুড়া নদীর উপর পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সেতু দুটি। সেতু ব্যবহার না করতে পারায় চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকার স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থী ও রোগীসহ প্রায় ৬টি গ্রামের জনসাধারণকে।
দীর্ঘদিন ধরে সেতু দুটির এমন করুণ অবস্থা থাকলেও এনিয়ে যেনো কারণ কোন মাথা ব্যথা নেই। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানের পোস্ট করা একটি ছবির কল্যাণেই তা চলে আসে জনসম্মুখে। এরিই সূত্র ধরে স্থানীয় সাংবাদিকরাও সরেজমিনে সেতু নির্মাণস্থল পরিদর্শন করে সেতু ব্যবহার না করতে পারায় এলাকাবাসীর দূর্ভোগ তুলে ধরেন গণমাধ্যমে।
চলাচলের ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর সুবিধার জন্য সংযোগ সড়ক নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিয়েই সেতু দুটি নির্মাণ কাজ শুরু করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। একটি সেতু নির্মাণের কাজ পুরো সম্পন্ন করা হলেও অপরটিতে শুধু মাত্র নির্মিত হয়েছে নদীর মধ্যবর্তি অংশটুকু। তবে সম্পন্ন হওয়া সেতুর দুদিকে সংযোগ সড়ক না হওয়ায় নির্মাণের পর থেকে এলাকাবাসীর কোন কাজে আসছে না সেতুগুলো। যার ফলে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা সেতুগুলো নিয়ে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর পূর্বে উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মাটিজুড়া নদীর উত্তর পার্শ্বে থাকা কালিটেকা, চানপুর (উত্তর পাড়) এবং নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে থাকা মৌলভীরগাঁও, মীরেরগাঁও ও উজাইজুড়ী গ্রামবাসী একত্রে কালিটেকা গ্রামের ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। তখনকার সময়ে কালিটেকা গ্রামে যাতায়াতের কোন রাস্তা ছিল না। একপর্যায়ে চানপুর ও উজাইজুড়ী গ্রামবাসী তাদের গ্রামের নিজস্ব ঈদগাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে কালিটেকা, মৌলভীরগাঁও ও মীরেরগাঁও গ্রামবাসী কালিটেকা গ্রামের ঈদগাহে নামাজ আদায়সহ তিন গ্রামবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে এলাকাবাসী রাস্তা ও মাটিজুড়া নদীতে ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহন করেন।
আর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর ১৯৯৮ সালে মৌলভীরগাঁও গ্রামের কৃতিসন্তান ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি সদ্য প্রয়াত আ.ন.ম শফিকুল হকের প্রচেষ্ঠায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদের মাধ্যমে মাটিজুড়া নদীর উপরের দুটি সেতু’সহ এলাকায় মোট ৬টি সেতু নির্মাণ করান। মাটিজুড়া নদীর উপর সেতু দুটি নির্মাণের পূর্বে স্থানীয় লোকজন সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য জায়গা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্ত সেতু নির্মাণের পর সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করতে গেলে এলাকাবাসী সড়কের জন্য তাদের জায়গা ছেড়ে না দেওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় সড়ক নির্মাণের কাজ। ফলে সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও নির্মিত হয়নি সম্পন্ন হওয়া সেতুর সংযোগ সড়ক। আর সংযোগ সড়কের জায়গা এলাকাবাসী ছেড়ে না দেওয়া বন্ধ হয়ে যায় অপর সেতু নির্মাণের কাজও। ফলে এই দুটি সেতু সুফল পাওয়া থেকে আজও বঞ্চিত রয়েছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিন কালিটেকা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাটিজুড়া নদীর উপর নির্মিত ও অর্ধনির্মিত দুটি সেতু প্রায় দুই থেকে আড়াই শত গজের ভিতরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে কালিটেকা ও মৌলভীরগাঁও গ্রামবাসীর যাতায়াতের জন্য প্রবাসী সিরাজুল ইসলাম হাজারীর ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত সেতুর দু’পার্শ্বেই নেই এ্যাপ্রোচ। তাই নদীর মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছে সেতুটি। ওই ব্রিজের একটি পশ্চিম পার্শ্বে, কালিটেকা ও মীরেরগাঁও গ্রাবাসীর যাতায়াতের জন্য অপর যে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই ব্রিজের একপার্শ্বে সংযোগ রাস্তা থাকলে অন্য পার্শ্বে রয়েছে কবরস্থান।
ফলে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে দুটি ব্রিজই। কালিটেকা গ্রামবাসী যাতে সহজে মৌলভীরগাঁও ও মীরেরগাঁও গ্রামে যাতায়াত করতে পারেন এজন্য ওই পরিত্যক্ত দুটি ব্রিজের মধ্যখানে বাঁশ দিয়ে তৈরী করেছেন একটি বাঁশে সাঁকো। ওই সাঁকোটিও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। কালিটেকা গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ওই বাঁশের সাঁকো দিয়েই মৌলভীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মীরেরগাঁও গ্রামস্থ হযরত বড় পীর (রহ.) দাখিল মাদ্রাসায় যাতায়াত করছেন কালিটেকা গ্রামের শিক্ষার্থীরা।
হযরত বড় পীর (রহ.) দাখিল মাদ্রাসার ৩য় শ্রেণীর ছাত্রী মাহিমা আক্তার জানায়, চানপুর গ্রাম হয়ে মাদ্রাসায় যেতে অনেক সময় লাগে। ওই রাস্তা দিয়ে গেলে সঠিক সময়ে মাদ্রাসায় উপস্থিত হওয়া যায় না। তাই দ্রুত সময়ে মাদ্রাসায় যেতে ঝুঁকিপূর্ণ ওই বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করি। সংযোগ সড়ক সম্পন্ন করা হলে এলাকাবাসী উপকৃত হবেন।
মীরেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম এবং মৌলভীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, মাটিজুড়া নদীর উত্তর পাড়ে কালিটেকা, চানপুর (উত্তর পাড়) এবং নদীর দক্ষিণ পাড়ে মৌলভীরগাঁও, মীরেরগাঁও ও উজাইজুড়ী গ্রামবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে আমাদের এলাকার কৃতি সন্তান সদ্য প্রয়াত আ.ন.ম শফিকুল হকের প্রচেষ্টায় ১৯৯৮ সালে মাটিজুড়া নদীর উপরের দুচি সেতু’সহ এলাকায় মোট ৬টি সেতু নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে নদীর উপর নির্মিত দুটি ব্রিজের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করার জন্য স্থানীয় লোকজন প্রথমে জায়গা দিতে রাজি থাকলেও পরবর্তীতে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে যান। ফলে সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় নির্মিত সেতু দিয়ে এলাকার মানুষ চলাচল করতে পারছেন না। তবে সম্পন্ন হওয়া সেতুর সংযোগ সড়ক সম্পন্ন করার জন্য মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বর্ষিয়ান নেতা আ.ন.ম শফিকুল হক আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিশ্বনাথ উপজেলা প্রকৌশলী (অ. দা.) হারুনুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, সংযোড় সড়ক ছাড়া কিভাবে সেতু নির্মাণ করা হল, তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।