২০ মে ২০১৯


ধানের মূল্য বিপর্যয়ে দিশেহারা কৃষক

শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি

হবিগঞ্জ : ‘ভাই জমি চাষ করছি ৩৫ একর। খরচ অইছে তিন লক্ষ টাকা। পুরা বছর পরিশ্রম কইরা ধান পাইতাম না দুই লাখ টাকারও। এই অবস্থায় পরিবার লইয়্যা আমার মতো কৃষকের বাইচ্যা থাকা দায়। চিন্তা করতাছি সামনের বছর থাইক্যা কৃষি কাম (কাজ) ছাইরা দিমু।’ আজমিরিগঞ্জ উপজেলার হিলালপুর গ্রামের ওয়ারিশ মিয়া এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় এভাবেই দুঃখ প্রকাশ করেন।

ওয়ারিশ মিয়া জানান, প্রতি একর জমির রমজমা ৫ হাজার টাকা। জমি চাষ থেকে শুরু করে ধান কেটে ঘরে তুলতে খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার। একর প্রতি খরচ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকা। প্রতি একরে ধান হয় প্রায় ১৫ মন। ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করলে পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। পরিবারের সকল সদস্যদের পরিশ্রমের পর একর প্রতি ৫০০ টাকা লোকসান। তিনি আরো জানান, সরকার যদি ধানের দাম বৃদ্ধি না করে তাহলে আমাদের মতো কৃষকদের না খেয়ে মরতে হবে।

একই এলাকার শামসুল আলম জানান, তারা প্রায় ৮ মাস ধরে কষ্ট করে ৩০ একর জমিতে ফসল ফলিয়েছি। এই জমি থেকে আয়ের আশায় অনেক টাকা লগ্নিও করতে হয়েছে। সরকার যেভাবে ধানের দাম কমিয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিতে হবে বলেও জানান তিনি।

হবিগঞ্জ রূপালী ম্যানসের সত্ত্বাধিকারী ও বানিয়াচং উপজেলার বড় খামারি রোটারিয়ান রেজাউল মোহিত খান জানান, তাদের প্রতি একরে ধান হয়েছে ১০ মন। ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ৪ হাজার টাকা। ধান কাটতে ৪ জন শ্রমিককে দিতে হয় মাথাপিছু ৬০০ টাকা হারে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ট্রলি দিয়ে খলায় ধান নিয়ে আসতে আরো খরচ হয় ১ হাজার টাকা। এরপর ধান শুকানো, গোডাউনে রাখা পর্যন্ত খরচ মিলে পুরো ১০ মনের দামই খরচ হয়ে যায়।

হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ উপজেলার বিরাট গ্রামের কৃষক রুবেল জানান, সারাবছর খরচ আর খাটনি দিয়ে বোরো ফলিয়েছেন কিন্তু ধানের যে দাম হয়েছে তা থেকে সকল খরচ বাদ দিলে লাভ তো হয়ই না। উল্টো লোকসানে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষি কাজ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনও উপায় নেই।

সরেজমিনে জেলার বানিয়াচং ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলার হাওরে দেখা যায়, ধানের কাজে ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণীরা। কেউ ধান শুঁকাচ্ছেন, কেউ মাড়াই করছেন, খড় শুকাচ্ছেন কেউ, আবার ধান সিদ্ধ দিচ্ছেন অনেকে। কাজে তফাত নেই নারী-পুরুষ ও শিশুর। যে যার মতো করে যা পারছেন, সে কাজেই সবার মনোযোগ। ধানের খোলায় এসময় কথা হয় ধান শুকানো কাজে ব্যস্ত আজগর মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, গত বছর শ্রমিক সংকটের কারণে তাদেরকে লোকসানে পড়তে হয়েছিল। এর আগের বছর সব ধ্বংস হয় আগাম বন্যায়। আর এ বছর ধানের দামে বিপর্যয়। পর পর তিন বছরের লোকসানে কৃষকরা সংকটের মুখে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকদের না খেয়ে মরতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কথা হয় আজমিরিগঞ্জ উপজেলার তরুণ কৃষক জাকির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, সারাবছর কষ্ট করে ফসল ফলানোর পর ধান কাটা শ্রমিকদের কাছে জিম্মি থাকতে হচ্ছে কৃষককে। আগে যারা বেশি জমি চাষ করতেন, তারা প্রায়ই অর্ধেকের চেয়েও কম জমি চাষ করেন এখন। তিনিও আগামী বছর শুধু খোরাকীর পরিমাণ জমি চাষ করবেন।

এ ব্যাপারে ধান চাউল ব্যবসায়ী মো. আদম আলী জানান, চিকন চালের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি। মোটা ধানের চাল ক্রয়ে অনীহা তাদের। হবিগঞ্জ জেলার শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই মোটা ধান। যে কারণে ধানের দাম অনেকটা কম থাকে। ইদানীংকালে উত্তর বঙ্গে অত্যাধুনিক মিল স্থাপন হয়েছে। যেগুলোতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চালকে চিকন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। যে কারণে আমাদের এলাকার ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে পেড়ে উঠেন না। এছাড়া এখান থেকে ধান পাঠিয়ে চাউল চিকন করতে খরচ অনেক বেশি। যে কারণে সেটাও সম্ভব নয়। তবে কৃষকের ব্যাপারে সরকারকে আরো আন্তরিক হতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

হবিগঞ্জ জেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, এ বছর বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭২ হেক্টর। কিন্তু চাষ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর। সম্ভাব্য ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ৪৩ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন।

শেয়ার করুন