১৩ মে ২০১৯


বাতির নীচে অন্ধকার!

শেয়ার করুন

উপজেলা প্রতিনিধি

ফেঞ্চুগঞ্জ : সংযোগ আছে। সরবরাহও আছে পর্যাপ্ত। তারপরও ভোগান্তি গেলো না ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ২৭ হাজার গ্রাহকের। এই রমজানেও বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় ভোগছেন উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা।

দিন নেই রাত নেই, লোড শেডিংয়ের যাতাকলে বসবাস উপজেলার লোকজনের। অথচ ‘আলোর জনপদ’ খ্যাত ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে ৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত ৪৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে যাচ্ছে জাতীয় গ্রীডে।

‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ শ্লোগানে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল কার্যালয় গত ৫/৬ মাসে ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ নামে প্রায় দেড় হাজার নতুন সংযোগ প্রদান করেছে। এ কাজ এখনো চলমান।

সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি ট্রান্সফরমারগুলোর ধারন ক্ষমতার বাহিরে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে গ্রাহকদের সাথে চরম প্রতারনা করে চলেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিস।

অভিযোগ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ কর্মসূচী বাহ্যিকভাবে সফল করতে তাঁরা (পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি) সেবার জন্য নয়, ব্যবসার জন্য খুব সহজ শর্তে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝড় বৃষ্টি ও রাস্তা সংস্কার কাজের দোহাই দিয়ে তাদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফেঞ্চুগঞ্জে ৫টি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এরমধ্যে কুশিয়ারা পাওয়ার প্লান্ট ১৬৫ মেগাওয়াট, বারাকাত উল্লাহ ডায়নামিক লিমিটেড থেকে ৫১ মেগাওয়াট, হোসাফ পাওয়ার লিমিটেড ৫০ মেগাওয়াট এবং সরকারি পিডিবির আওতাধীন ২টি থেকে ১৮০ মেগাওয়াট উৎপন্ন হয়ে ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রীডে যায়।

ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের চাহিদা মেটালেও উৎপাদনস্থলের মানুষ থাকেন ঘন্টার পর ঘন্টা অন্ধকারে। যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রস্থলে ভোগান্তিতে গ্রাহকরা। এযেনো বাতির নীচে অন্ধকার!

উপজেলার দু’টি সাব স্টেশনে ১৩২/৩৩ কেভিতে ২৭ মেগাওয়াট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এরমধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জ, ভাটেরা ও আখড়াঘাট এরিয়া নিয়ে গঠিত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিসে গ্রাহক সংখ্যা ২৭ হাজারের উর্ধ্বে। এখানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমান মাত্র ৮ মেগাওয়াট। অথচ বর্তমান সময়ে বিদ্যুতের ভেল্কিবাজিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দীন ইসকা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে রেকর্ড পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া স্বত্বেও লোড শেডিংয়ের প্রশ্নই উঠেনা। সামান্য ঝড় বৃষ্টিতে উপজেলা সদরের বাহিরে গড়ে কখনো ২০ ঘন্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এছাড়া ১০/১৫ মিনিট পরপরই বিদ্যুতের ভোগান্তিতে জনজীবন অতিষ্ট পড়েছে।

তিনি বলেন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সরকারের মহৎ উদ্যোগ। অথচ ট্রান্সফরমারগুলোর ধারন ক্ষমতার বাহিরে শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করে গ্রাহকদের সেবা প্রদান না করে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ চরম ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছে।

ঘিলাছড়া ইউনিয়নের বাদেদেউলী গ্রামের আব্দুস সালাম কামাল জানান, পবিত্র রমজান মাসে বিদ্যুতের চরম বিড়ম্বনা নিয়ে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের এমন বেহাল অবস্থা অতিতে কখনো ছিলনা। সামান্য বাতাসে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। আকাশে সামান্য মেঘ দেখা গেলেই বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় পড়তে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। আর গ্রাহকরা যাতে অভিযোগ করতে না পারেন, এ জন্য জোনাল অফিসের জরুরী নাম্বারগুলো ব্যস্ত রাখা হয় সর্বদা।

তিনি বলেন, গ্রীডে সমস্যা, জাম্পার পুড়ে গেছে, ফিউজ কেটে গেছে, বাতাসে লাইন ছিড়ে গেছে, লোকবল নেই- এমন মুখস্থ উত্তর সব সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রন কক্ষের।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ইসহাক আলী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারো হাত নেই। গ্রাহকসেবা নিশ্চিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিস হলেও জনবল যানবাহন ও যন্ত্রপাতি সংকট রয়েছে।

তিনি আরো জানান, ১৩২/৩৩ কেভি ফেঞ্চুগঞ্জ গ্রীড উপকেন্দ্রে সন্ধ্যায় ওভার লোডের কারনে রেডহট দেখা দেয়। তাই লাইন বন্ধ করে গ্রীডে কাজ করতে হয়। গ্রীডে অতি পুরাতন যন্ত্রপাতি তাই এমন হয়। এ জন্য সংস্কারের কাজ চলছে।

এক প্রশ্নে জবাবে ডিজিএম আরো জানান, ফেঞ্চুগঞ্জে যে ক্যাপাসিটি আছে তা আগামী ২০ বছরেও ঘাটতি হবেনা। দু’টি সাবষ্টেশনে ২৭ মেগাওয়াট ক্যাপাসিটির মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৮ মেগাওয়াট। তাছাড়া পালবাড়ীতে আরো একটি সাবষ্টেশন তৈরী হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ফেঞ্চুগঞ্জ জোনাল অফিসের সংশ্লিষ্টরা জানান, অফিস কর্তাদের গাফিলতির কারণে বিদ্যুৎ ভোগান্তি পোহাগে হচ্ছে গ্রাহকদের। ট্রান্সফরমারগুলোতে লোডের কোন তোয়াক্ষা নেই। যে যার মত সংযোগ দিচ্ছে, পুরাতন লাইন সংস্কার হচ্ছেনা। লোড শেডিংয়ের নামে মেরামতের খাত দেখিয়ে বিল তৈরী করে বিপুল অংকের টাকা আত্মসাত করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন