২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯


ভার্চুয়াল অ্যাপসে চাঁদের দেশে

শেয়ার করুন

শাবি প্রতিনিধি : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাদিক মাহদি ও কাজী মইনুল ইসলাম ভালোবেসে সেকেন্ড মেজর হিসেবে ভর্তি হয়েছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে। সেকেন্ড মেজর সিএসই এর ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্ট করতে গিয়ে ভি-আর নিয়ে কাজ করেন তারা দুজন। তাদের সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী।

আবু সাদিক মাহদি ও কাজী মইনুল ইসলাম প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে চিন্তা করেছিলেন শাবির তৈরি মোবাইল এসএমএসে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন পদ্ধতি এখন প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এ পদ্ধতি চালু করেছে। কিন্তু, আগে ভর্তি ফরম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হাতে জমা দিতে হতো। এতে সুবিধা হলেও একটা বিষয় নিয়ে তারা ভেবেছিলেন। আবেদন করতে এসে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখে যেত ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে পারতো। কিন্তু মোবাইলে আবেদন করায় তাদের এই সুযোগটা এখন নেই। সেজন্য প্রজেক্ট নিয়ে তারা ভাবে এমনকিছু তৈরি করা যায় কি? যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোন জায়গা থেকে শাবির পুরো ক্যাম্পাস দেখা যাবে।

একাডেমির প্রজেক্টের কাজে একটা ভার্চুয়াল অ্যাপস বানানোর স্বপ্ন দেখেন তারা। তারপর দুইজন ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এটার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ আট মাস কাজ করে সাস্ট ভার্চুয়াল ট্যুর নামের অ্যাপস তৈরির মাধ্যমে তাদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেন তারা। যার মাধ্যমে পুরো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটা ভার্চুয়ালি দেখা যাবে যেকোনো জায়গা থেকে। সাস্ট অলীক টীমের সদস্যদের ভার্চুয়াল জগতের চিন্তার শুরুটা এখান থেকেই।

২০১৮ সালে পূজার ছুটি, ক্যাম্পাস বন্ধ। ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করছিলো কোথাও ঘুরতে যাবে। এমন সময় হঠাৎ টুইটারে তারা জানতে পারে নাসার প্রতিযোগিতা আবারও শুরু হবে। তখন তারা নাসার সাইটে খোঁজ নিতে থাকে। প্রতিযোগিতা শুরুর ১মাস আগে নাসা থেকে একটা ধারণা দেওয়া ছিল। কোন কোন বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। তখন অলীক খোঁজ করেছিলেন ভি-আর সম্পর্কিত কোন সমস্যা আছে কি না। পরে প্রতিযোগিতা শুরু আগে ৮ই অক্টোবর ২০১৮ তারিখে চূড়ান্ত সমস্যা দেওয়া হয়েছিল নাসার ওয়েবসাইটে, তখন অলীক জানতে পারে ভি-আর সম্পর্কিত সমস্যার কথা। নাসা থেকে তথ্য নিয়ে ভি-আর এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। তখন যেন পরীক্ষার হলে প্রশ্ন কমন পড়ার মতই একটা অবস্থা। সাস্ট ভার্চুয়াল ট্যুরের ধারণা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আকাশ সমান স্বপ্ন নিয়ে কাজে নেমে পড়েন অলীকের চার তরুণ। তারা হলেন শাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মইনুল ইসলাম, আবু সাবিক মাহদি এবং সাব্বির হাসান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম রাফি আদনান।

এতক্ষণে অলীক টীম পুরোদমে ‘লুনার ভিআর’ ভার্চুয়াল অ্যাপসের কাজ শুরু করে দেন। কাজ শেষে ১৯ই এবং ২০শে অক্টোবর ঢাকায় ‘ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেসিসের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।

স্যার আমাদের প্রজেক্ট দেখবেন প্লিজ
বেসিসের আয়োজনে ঢাকাতে অনুষ্ঠিত নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করা দেশের মোট ৪০টি টীম যখন অনেক বড় যন্ত্রপাতি, কেউ রোবট নিয়ে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখছিল। সেসময় অলীক টীম তাদের ল্যাপটপ একটা মোবাইল ভি-আর বক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। এতো অল্পকিছু জিনিস নিয়ে প্রজেক্ট যা বিচারকদের নজরে পড়তে কষ্ট হওয়ায় অলীক টীমের সদস্যরা বলতেন স্যার আমাদের প্রজেক্টটা দেখবেন প্লিজ! এভাবে ডেকে ডেকে দেখানো অলীক টীম ঢাকায় আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মনোনয়ন পেয়ে পরবর্তী ১ মাস লুনার ভিআর এ আপডেট দেন এবং তারাই বিশ্বসেরা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেন।

অলীক টীম লিডার আবু সাবিক মাহদি লুনার ভিআর নিয়ে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিলো স্বল্প খরচে কিভাবে মানুষ এটাকে ব্যবহার করতে পারবে। ছোটবেলা থেকে আমরা চাঁদ সম্পর্কে জেনে আসছি কিন্তু সবার তো সেখানে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছে যারা চাঁদে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই অ্যাপস ব্যবহারে মানুষ জানতে পারবে চাঁদের পৃষ্ঠটা দেখতে কেমন, সেখানে কী কী আছে, সেখানকার তাপমাত্রা কেমন, মহাকাশ যান অ্যাপোলো-১১ কোথায় অবতরণ করেছিল? সেটা দেখতে কেমন? এগুলো জানা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ আছে যারা জানে না চাঁদের উপর কি আছে। তাদের জন্য এসব জানা অনেক সহজ হবে। তিন জিবি র‌্যাম বিশিষ্ট একটা মোবাইল এবং ৫০০-৭০০ টাকার ভিতর একটা ভি-আর বক্স দিয়ে খুব সহজে ভার্চুয়ালি দেখা যাবে এবং এটা ব্যবহার করে চাঁদ সম্পর্কে শিশুদের জানানো যাবে।’

ঢাকায় অলীকের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে টীমের সদস্যরা বলেন, ‘আমরা যখন প্রেজেন্টেশন দিবো তার আগে ড্রিমার ল্যাব কোম্পানির প্রতিষ্ঠা আমাদের বলেছিলেন আপনারা যেটা প্রেজেন্টেশন করবেন, সেটা প্রজেক্টরের মাধ্যমে তার একটা লাইফ দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এটা অনেকটা রিস্কি ছিল। তবুও আমরা রিস্ক নিয়ে খুব অল্প সময়ে এটা লাইভ দেখাই। এটা লাইফ দেখাতে গিয়ে আমাদের ২০ সেকেন্ডের মতো সময় নষ্ট হয়ে যায়। আমরা মোট ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ড সময় পেয়েছিলাম প্রেজেন্টেশনের জন্যে।

অলীকের পথচলা
অলীক (কাল্পনিক) নামের শুরুটা মজা করে হলেও শেষটা বাস্তবে বিশ্বজয়ী একটা নাম। গেমের কাজের তেমন কোন ধারণা ছিলো না অলীকের। একদিন তারা বাইরে থেকে একটা গেমের কাজ পেয়েছিলেন। সেই কাজ করতে গিয়ে তারা নানান রকম অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তখন তারা সবাই মিলে মজা করে বলতো, আমাদের একটা কোম্পানি বা স্টুডিও থাকবে যার নাম হবে অলীক। তারপর থেকে তারা টীমের নাম দেন অলীক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে তারা ক্যাম সাস্ট নামের মহাকাশ বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন একটা সংগঠনের সদস্য হন তারা। সেখান থেকে তাদের একসাথে কাজ করা শুরু। ক্যাম সাস্টের একটা প্রজেক্টে তারা কাজ করেছিলো একসাথে। কম খরচে টেলিস্কোপ বানানো। এছাড়াও রোবোটিকস, অ্যানিমেশন বানানোর চেষ্টাও করতো তারা। এটা ছিলো অলীক টীমের তিনজন সদস্যের একসাথে পথচলা। কিন্তু, অন্য সদস্য সাব্বির হাসান তাদের থেকে দুই বছরের জুনিয়র। সে যখন ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয় তখন তার কাছ থেকে জানতে পারছিল সে অনলাইনে অনেক কাজ করেন। সাব্বির হাসানকে নিয়ে টীম লিডার আবু সাবিক মাহদী বলেন, ‘সাব্বির ওয়ার্ড পেজ ডেভেলপমেন্ট কাজে বাংলাদেশের অন্যতম একজন। তার সুবাধে আমরা অনেক কাজ পাইছি এবং সে এই বিষয়ে আমাদের চেয়ে অনেক জানে।’

অলীকের পথচলা আরও আগে থেকে, এর আগে ২০১৬ সালে অলীক প্রথম ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। সেই টীমে ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মইনুল ইসলাম, আবু সাদিক মাহদি এবং ইরফান হোসেন ইমু ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম রাফি আদনান ছিলেন। টীমে ছিলো না শুধু সাব্বির হাসান। তখন সাব্বির হাসান সবেমাত্র ক্যাম্পাসের নতুন ছাত্র। সে বারের প্রতিযোগিতায় অলীক ‘কিউব সেট’ (এটা মূলত ছোট স্যাটেলাইট) যা অন্য গ্রহে গিয়ে কোথায় কোন সম্পদ আছে সেগুলো কিভাবে গ্রহণ করবে এমন কিছু তথ্য দিবে, এরকম একটা সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। এব্যাপারে অলীক টীম লিডার আবু সাদিক মাহদি বলেন, ‘তখন আমাদের কাছে ওখানে গিয়ে মনে হয়েছিল অন্যদের থেকে আমাদের প্রজেক্টা এতোটা ভালো ছিলো না। কিন্তু বেসিসের আয়োজন এবং সেখানকার পরিবেশটা অনেক ভালো লেগেছিলো।’ তখন আমরা নিজেরাই বলতাম আমরা আগামী বছরও আসবো।’ কিন্তু একাডেমিক পরিক্ষা থাকার কারণে পরের বছর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়নি অলীকের।

বিশ্বসেরা অলীক
এদিকে, ‘লুনার ভিআর’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করে বিজয়ী শাবির টীম অলীককে নাসা থেকে তাদের প্রথম বাচাই এর পরে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতের প্রথম প্রহরে তাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ ও নাসা আমন্ত্রনের ব্যাপারে তাদের সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হবে বলে সর্বশেষ ইমেইল এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের ফেইসবুকের মাধ্যমে টীম অলীক এবং এর সদস্যদের অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশের আয়োজক বেসিস টীম অলীকের সাথে যোগাযোগ করে বলেন আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টা জানিয়েছি এবং অতিশীঘ্রই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করবো।

বাংলাদেশের বিশ্বসেরারা কী ভাবছে আগামী দিনগুলো নিয়ে
পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্বসেরা অলীকের টীম লিডার এবং সদস্যরা বলেন, ‌‘আমাদের এটা নিয়ে পরবর্তী কাজ হলো ‘লুনার ভিআর’ এর একটা বাংলা ভার্সন তৈরি করা। যেন আমাদের জন্য ব্যবহারে একটু সহজ হয়। আমরা আমাদের দেশটাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চাই। আমরা মানুষের চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন করে চাই। তখন সত্যজিৎ রায়ের কথা বলে বলেন একই ক্যামেরা দিয়ে অনেকে অনেক কিছু করছে। কিন্তু তিনি তার কাজের মাধ্যমে একটা ধারণা, একটা ম্যাসেজ দিয়েছেন মানুষের কাছে। ঠিক তেমনই আমরা কিছু গেমস নিয়েও কাজ করবো যেটা শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, এটার মাধ্যমে মানুষকে অনেক ভালো ধারণা দেওয়া যাবে এবং মানুষের একটা ম্যাসেজ দেওয়া যাবে। ’

শেয়ার করুন