১৯ জানুয়ারি ২০১৯

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারে পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বিপন্নের তালিকায় রয়েছে শকুন। এসব শকুনদের একটিরও দেখা মিলছে না পুরো জেলার কোথাও। একসময় শকুন ছিল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ চিরচেনা পাখি। সেই সময়ে গরু-ছাগল মারা গেলেই দল বেঁধে হাজির হতো শকুন। বিশেষ করে জেলার কুশিয়ারা,মনু,ধলাই নদীতে এসব মরা প্রানীদের ফেলে দিলে এখানকার আকাশে শত শত শকুনের বিচরণ দেখা যেত।
একটি শকুনকে নিচে নামতে দেখলেই বাকিগুলো তাকে অনুসরণ করেই নদীতে ভেসে আসা মরা পশুকে ভাগ করে খেয়ে নিত। আকাশে উড়া শকুন দেখে মানুষ বুঝতে পারতো ওই আকাশের ঠিক নীচে কোন প্রানী মরা পড়েছে। নদী পাড়ের শিশুরা ও খেলা করতো শকুনের সাথে। নদীতে এসব শকুনরা খাবার খেয়ে পাড়ের সবচেয়ে উচু তালগাছ ও শিমুল গাছে ডানা মেলে বসে থাকতো। শকুনই একমাত্র পাখি যারা গবাদিপশুর মৃতদেহ সতেজ থাকা অবস্থাতেই চামড়া ফুটো করে খেতে পারে। মৃত গবাদিপশুর মাংস খেয়ে শকুন পরিবেশ পরিছন্ন করে। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু হজম করার ক্ষমতা শকুনের আছে। এখন নদী পাড়ে শিমুল, তাল, বট,রেইনট্রি, কড়ই কিংবা উচু কোন গাছ অথবা ঝোপ-ঝাড় নেই আগের মত । তার সাথে নেই শুকুনও ।
পরিবেশবিদরা বলেছেন, উল্যেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে অধিক ফলনের আশায় কৃষক জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে শকুনসহ অন্যান্য প্রজাতির পাখিদের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কলকারখানার দূষিত বর্জ্যর কারণে পরিবেশসহ মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে শকুনসহ নানা প্রজাতির পাখি।
এছাড়াও গ্রামাঞ্চলে আর আগেরমত গণহারে পশু পালন করা হয়না। যান্ত্রিক মেশিনারি যন্ত্রপাতি বের হওয়াতে গরু-মহিষ ছাড়াই মানুষ কৃষি ক্ষেত করতে পারছে। যে কটি গবাদি পশু আছে এগুলোর দু-একটি মারা পড়লে মৃতদেহ খোলা আকাশের নিচে ফেলে না দিয়ে মাটির নিচে পুুঁতে রাখে, যে কারণে শকুন চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে। শস্যক্ষেতে বিষটোপ, খাদ্য সংকট ও গবাদিপশুর চিকিৎসার প্রদাহরোধক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ব্যবহারে এবং প্রাচীন ও উঁচু গাছ নিধন হওয়ায় শকুন কমতে কমতে এখন শকুনের অস্থিত্ব প্রায় শূন্যের কোটায়। মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম এর সভাপতি সৈয়দ মহসীন পারভেজ বলেন, খাদ্য সংকটসহ খাল-বিল,নদী-নালা ভরাট ও উচু গাছ পালা হারিয়ে যাওয়ায় শকুনের শঙ্কট দেখা দিয়েছে।
চির চারিত গ্রাম বাংলার প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক পাখি। শুধু সৌন্দর্য্যই নয়, প্রকৃতির অলংকার বলেও আখ্যায়িত করা হয় এদের। এসব পাখি শুধু সৌন্দর্য্য হিসেবে দেখা হয়না, প্রকৃতির ফুল ও ফসলের ভান্ডার বৃদ্ধিতে অংশ নিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পাখির জন্ম প্রকৃতির কোলেই আবার এদের আশ্রয়দাতাই প্রকৃতি। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে মানুষের। পাখির ডাকেই সন্ধ্যা নামে। পাখি যেন মানুষের জীবনেরই একটা বিশেষ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীতে এমন একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে পাখি ভালোবাসে না, পাখির গান শুনতে পছন্দ করে না, পাখির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় না। কয়েক দশক আগেও গ্রাম বাংলা সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। ঝোপ-ঝাড় ছিল। চারপাশ মুখরিত ছিল পাখির কলকাকলিতে।
জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে মৌলভীবাজারে উজাড় হচ্ছে বিভিন্ন গাছ ও বনাঞ্চল। মানুষের প্রয়োজনে জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্থা-ঘাট, স্থাপনা,বাজারসহ লোকবসতি। আর এতে করেই ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আর প্রকৃতি বিপন্ন হবার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের প্রানী বিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. জুবায়ের আহমদ বলেন, ‘শকুনেরা মুলত আবর্জনাযুক্ত পঁচা খাবার খায়। এ খাবার না পাওয়ার কারণসহ পরিবেশগত কারণে এরা হারিয়ে যেতে পারে। এছাড়াও পশু পুতিঁয়ে রাখার কারণেও শকুনেরা তীব্র খাবার সংকটে পড়ে হারিয়ে যায়।’