১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে মর্যাদার লড়াইয়ে নেমেছেন নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের দুই হেভিওয়েট পরিবারের দুই প্রার্থী। এক পরিবার দেওয়ান আর অন্য পরিবার পীর বলে এলাকায় খ্যাত রয়েছে।
এক ইউনিয়নে ছিলেন দুই নামকরা মন্ত্রী। তারা দু’জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা। তবে তাঁরা আজ শুধুই স্মৃতিতে অমলিন। কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকারীরা আজও তাদের নামগুলো উচ্চারণ করছেন বার বার। কীর্তিমান সেই দুই মন্ত্রীর মুখচ্ছবি এখন স্পর্শ করছে মানুষের হৃদয় মন। তাঁরা আর কেউ নয় প্রয়াত মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী ও প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়া। আর এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া দুই প্রার্থীর সম্ভলই তাদের প্রয়াত পিতার ক্লিন ইমেজ।
দেওয়ান ফরিদ গাজী (১৯২৪-১৯ নভেম্বর ২০১০) একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি সিলেটের নবীগঞ্জ উপজেলার, দেবপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে হবিগঞ্জ-১ সংসদীয় আসন (নবীগঞ্জ-বাহুবল) থেকে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। পরে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দেওয়ান ফরিদ গাজী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ছিলেন। তিনি শেখ মুজিব সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরে তিনি সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় দেওয়ান ফরিদ গাজী বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
আর সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া (পুরো নাম- শাহ আবু মোহাম্মদ শামসুল কিবরিয়া। তিনি ১৯৩১ সালের ১মে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২৭ জানুয়ারি ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
শাহ এ এম এস কিবরিয়া ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের বৈদেশিক বিভাগে যোগদান করে পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক বিষয়ক বিভাগের মহা-পরিচালক হয়েছিলেন। ১৯৮১-১৯৯২ সালের মধ্যেকার সময়ে তিনি জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কমিশন (এসকাপ)-এর প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও কিবরিয়া ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৩ সদর-লাখাই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি গ্রেনেড হামলায় শহিদ হন।
তবে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনের এমপি ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী। তাঁদের দু’জনেরই বাড়ী নবীগঞ্জ উপজেলার ১০নং দেবপাড়া ইউনিয়নে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন দেওয়ান ফরিদ গাজী তনয় শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২৩ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন শাহ এএসএম কিবরিয়া তনয় ড. রেজা কিবরিয়া। একজন নৌকা ও অপরজন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
একই ইউনিয়নের দুই বাসিন্দার দুই জোটের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এলাকার মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনা। এ অঞ্চলের ভোটার কাকে রাখবেন আর কাকে বাদ দিবেন-তা নিয়ে পড়েছেন মহা-বিপাকে। এলাকার সব জায়গাতেই দুই প্রার্থীকে নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনেকেই আবার মজা করে বলেন, ‘এমপি যে দলেরই হোক আমাদের ইউনিয়নেরই হবে।’
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শাহনেওয়াজ মিলাদ গাজী নৌকা প্রতীকে ও ধানের শীষের প্রতীকে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে ড. রেজা কিবরিয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা দুজন একই ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও ডা. রেজা কিবরিয়া ৩নং ওয়ার্ডের জালালশাপ গ্রামের পীর বাড়ীর ছেলে। তিনি সিলেটের ৩৬০ আউলিয়ার এক সঙ্গী শাহ্ বুদ পীরের (রহ.) বংশধর। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহনেওয়াজ মিলাদ গাজী দেবপাড়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দেবপাড়া গ্রামের দেওয়ান বাড়ির ছেলে। এছাড়া রেজা কিবরিয়ার দাদীর বাড়ীও এই আসনের বাহুবল উপজেলার লামাতাশি ইউনিয়নের শিবপাশা গ্রামে।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘নবীগঞ্জ-বাহুবলের সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক। অনেকেই লন্ডনে থাকে, কিন্তু তার রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নবীগঞ্জ-বাহুবলের সঙ্গে আমারও সম্পর্ক আছে। আমি এলাকার মানুষের জন্য যা করতে চাই, তা কাজ করে আমাকে প্রমাণ করতে হবে। জনগণ এবং আল্লাহ সঙ্গে থাকলে কোনো শক্তি নেই আমাকে পরাজিত করবে। জয়ের ব্যাপারে আমি অনেক আশাবাদী।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাহনেওয়াজ মিলাদ গাজী বলেন, ‘আমার পিতা যে উন্নয়ন কাজ নবীগঞ্জ-বাহুবলে করেছেন, তা এর আগে কেউ করতে পারেনি। আমার পিতার এই উন্নয়ন ও কাজের মূল্যায়ন করবেন জনগণ। আমি আমার পিতার জীবদ্দশা অবস্থা থেকেই এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম, এখনো আছি।’
তিনি বিশ্বাস করেন আগের মতো নবীগঞ্জ-বাহুবলের মানুষ আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এই আসনটি উপহার দেবে।
দুই জোটের প্রার্থী একই ইউনিয়নে হওয়ায় দুইজনই ইউনিয়নের ভোটে সমানভাবে ভাগ বসাবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ভোটারা। এ নিয়ে ইউনিয়নের দুই প্রার্থীর ভোটার-সমর্থকদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপার ঈমাম বাড়ি এলাকার ভোটার হুমায়ুন কবির বলেন, দুজনই আমাদের এলাকার কৃতি সন্তানদের ছেলে। আমরা এবার ভোট বুঝে শোনেই দিব। যিনি এলাকার মানুষের পাশে থেকে উন্নয়নে কাজ করবেন এমন প্রার্থীকেই আমরা ভোট দিব।
দেবপাড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এডভোকেট জাবেদ আলী বলেন, ‘আমরা আনন্দিত জোট-মহাজোটের দুইজন প্রার্থীই আমার ইউনিয়নের কৃতি সন্তান। নির্বাচনে যেই এমপি হয়ে আসবেন সেই আমাদের ইউনিয়নের সার্বিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন বলে আমি মনে করি।
নবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান সেফু বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ড. রেজা কিবরিয়ার পক্ষে কাজ করছি। আমরা এবার আশাবাদী। এবার আমাদের বিজয় সু-নিশ্চিত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদেরকে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে। কোন মামলা না থাকার পরেও তাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। বেশ কয়েকজন নেতকর্মী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এ ব্যাপারে জেলা পরিষদ মেম্বারস এসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ বলেন, এই এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। আমাদের প্রার্থী সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক পরিচিত। ইনশাআল্লাহ এবারও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া শাহ এ এম এস কিবরিয়া সাহেবকে সাধারণ মানুষ সম্মান করলেও তাঁর পুত্রের এমন ডিগবাজি সাধারণ মানুষ মেনে নেননি।
নবীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘শাহ এ এম এস কিবরিয়া আওয়ামী লীগের ছিলেন। তাঁর পুত্র আওয়ামী লীগের কেউ নয়। সে এখন ড. কামালের দলে যোগ দিয়ে কিবরিয়া সাহেবের ইমেজ ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। নবীগঞ্জ-বাহুবলের মানুষ এখন আর বোকা নয়। কারো মিথ্যা কথায় কান দিবে না। সবাই বর্তমান সরকারের উন্নয়নে বিশ্বাসী। আমরা আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করছি। এবারো নৌকাকে বিজয়ী করে আসনটি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আবারো উপহার দিব।’