২৬ জুলাই ২০১৭


হাওরে মাছ নেই, জেলেদের দুর্দিন

শেয়ার করুন

মাহমুদুর রহমান তারেক (অতিথি প্রতিবেদক), হাওরাঞ্চল থেকে ফিরে : হাওরে হাওরে নতুন স্বচ্ছ পানি। অন্য বছর এই সময়ে হাওরে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়তো ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ। কিন্তু এবার সারা দিন জাল ফেলেও ২০০-৩০০ টাকার মাছ ধরতে পারছেন না সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা দেখার হাওরের জেলে মোহাম্মদ আলী। হাওরে মাছ না-থাকায় তার মতই হাজার হাজার জেলের দিন কাটছে অভাব অনটনে।

শুধু দেখার হাওর নয় এবছর সুনামগঞ্জের সব হাওর পানিতে টইটুম্বুর থাকলেও মাছের দেখা নেই। গত এপ্রিল মাসে ফসলডুবির পর বিষাক্ত এ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে হাওরাঞ্চলে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিলো। হাওর হয়ে পরেছিলো মাছশূন্য। সেই সংকট এখানো কাটেনি। মাছের দেশে মাছের দেখা পাচ্ছে না জেলেরা। হাওরের জেলেদের দুর্দিন চলছে।

দেখার হাওরের আরেক জেলে ইমান আলী বলেন, ধান ডুবার পর মনে করছিলাম মাছ ধইরা বছরটা যাইবো, কপাল খারাপ পরে মাছ মরতে শুরু করলো, মনে করছিলাম, নয়া পানি আইলে মাছ ধরা পড়বে জালে। কিন্তু সারা দিন জাল বাইলে বড় মাছ পাওয়া যায় না। সব ছোট মাছ।

সদর উপজেলার নীলপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার বলেন, সারা দিনে ২৫০-৩০০টাকার মাছ ধরা যায়, ই টাকা দি তো ৭জনের সংসাদ চালানি যায় না। আমরার ইবার দিন যার কষ্টে। তার দেয়া তথ্য মতে, ছোট প্রজাতির পুঁটি, টেংরা, কই, মলা মাছ, ছোট বাইম, ছোট বোয়াল জালে ধরা পড়ছে। রুই, কাতলা, বড় বাইমসহ বড় মাছ ধরা পড়ছে না। মাছের বাজার এখন পুকুরের মাছে সয়লাব। যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে পুকুরের চাষের মাছ। বিক্রেতারা হাওরের মাছ বলে ক্রেতাদের প্রতারিত করছে।

তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের রামজীবনপুর গ্রামের গৃহিণী রেজেলা বেগম বলেন, ছোট বেলা থেকেই গোলা ভরা ধান, হাওর ভরা মাছ দেখে আসছি। এইবার ধান গেছে, সাথে মাছও। ঘরের মানুষ(স্বামী) হাওরে যে মাছ পায় তা, বিক্রি করে দিয়া চাউল কিনে আনে, মাছ খাওয়া আমাদের হয় না।

এদিকে, হাওরে মাছ কম ধরা পড়ায় বিপাকে আছেন জেলেরা। আয়রোজগার কমে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকটা দুঃস জীবনযাপন করছেন তারা। যারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের সময়মত কিস্তি পরিষোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকে হাওর এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে রাজধানী ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট চলে গেছেন।

জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় প্রতিবছর ৮৯ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার স্থানীয় চাহিদা ৫৪ হাজার টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে ৩৫ হাজার টন। সরকারি হিসাবে গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৫০ টন মাছ মারা যাওয়ার কথা বলা হলেও মৎস্যজীবী ও কৃষকদের মতে, এতে প্রায় হাজার টন মাছের ক্ষতি হয়েছে। জেলার জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলেল আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষক, জেলে পরিবারগুলো খুব কষ্টে আছে, পর্যাপ্ত সরকারি সাহায্যদের পাশপাশি হাওর এক বছরের জন্য ইজারা প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শঙ্কর রঞ্জন দাশ বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬৬ লাখ টাকার পোনা মাছ মজুদ করা হয়েছে, বাজারে মাছও পাওয়া যাচ্ছে। তবে অবৈধভাবে কোণা জাল, কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ ধরা হচ্ছে, মাছের পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। আমরা মৎস অধিদপ্তর ও প্রশাসন যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তা রোধ করার চেষ্টা করছি। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে মৎস বিভাগ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তিনি জানান।

 

 

(আজকের সিলেট/২৬ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন