৩০ মে ২০১৮
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আজ বুধবার মাগফিরাতের ৩য় দিন। রমজান মাসকে সবর ও মুয়াসাতের মাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সবর হলো ধৈর্য আর মুয়াসাত হলো সহানুভূতি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধৈর্যের মাস রমজান।’ আর ধৈর্যের বিনিময় হলো জান্নাত। রমজান মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাস। এ মাসে মুমিন ব্যক্তির রিজিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য পাপের ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং সে রোজাদারের সমান নেকির অধিকারী হবে। রোজাদারের নেকিও হ্রাস করা হবে না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের সবাই তো রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ্য রাখে না? রাসুল (সা.) বললেন, ‘এ নেকি তো আল্লাহ তায়ালা একটি খেজুর, এক চুমুক পানি বা দুধ পান করালেও দান করবেন।’ (সহিহ ইবন খুযায়মা, ৩/১৯১, হাদিস নং ১৮৮৭; আল- বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, ৩/৩০৫, হাদিস নং ৩৬০৮)।
গরিব-দুখী মানুষরা বিভিন্ন সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে থাকে। রোজার মাধ্যমে রোজাদারের সে উপলব্ধির সুযোগ হয়। অন্যের দুঃখ-কষ্ট বোঝার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সহানুভূতি প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হয়। জাকাত ১ বছরে একবার আদায়যোগ্য ইবাদত হলেও তা আদায়ের জন্য মানুষ রমজানকে বেছে নেয়। আর সেটিই যথার্থ। এতে একদিকে সহানুভূতি প্রকাশের মাসে সহানুভূতি প্রকাশ করা যায়; অন্যদিকে রমজানের কারণে বেশি মাত্রায় নেকি পাওয়া যায়। সাদকাতুল ফিতরও রমজানে আদায় করাই সমীচীন। রাসুল (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগেই তা আদায় করতেন। ‘হজরত ইব্ন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের মধ্যে প্রত্যেক স্বাধীন ও দাস, পুরুষ ও মহিলা, ছোট ও বড় সবার ওপর সাদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন। এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব। আর তা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই আদায় করতে আদেশ দিয়েছেন। (বোখারি : ১৪৩২)।
রোজার মাধ্যমে গরিবদের জীবনযাত্রার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়েই রোজাদার ঈদের মুখোমুখি হয়। ঈদের আনন্দে সবাইকে শরিক করতে জাকাত ও সাদকাতুল ফিতর অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এ বছর আমাদের দেশে সাদকাতুল ফিতর নির্ধারিত হয়েছে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৫০ টাকা। সবারই সর্বনিম্নটি গ্রহণ না করে বরং সামর্থ্য অনুযায়ী সাদকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘যে আনন্দচিত্তে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা বাকারা : ১৮৪)।
এসব তো হলো অপরিহার্য দান। এর পাশাপাশি রমজানে অন্যকে ইফতার করানো এবং সাধারণ ও নফল দান-সাদকার পরিধি বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যয় করবে? বলে দাও, নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে, তা-ই ব্যয় করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা চিন্তা করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ২১৯)। অতিরিক্ত এসব দানের মাধ্যমে অতিদ্রæত আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা সম্ভব হয়। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে ওই কাজ সম্পাদন করার পর অতিরিক্ত কাজ করার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্তরিকতা তৈরি হয়। কারণ নির্ধারিত সময় ওই কাজ তো সবাই করে থাকে। এটি তার মূল দায়িত্ব। যখন সে মূল দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু করবে, তখনই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর হবে। তেমনি বান্দা ফরজ দানের পাশাপাশি যখন নফল দান আদায় করবে, কেবল তখনই আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে তার ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সম্পর্ক সুগভীর হবে। আর তা রমজান মাসে হলে তো কথাই নেই। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল দ্বারা আমার এমন নৈকট্য লাভ করে যে, আমি তাকে ভালবাসতে থাকি।’ (বোখারি : ৬১৩৭)। ‘রাসুল (সা.) দুনিয়ার সব মানুষ অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। রমজান মাসে তাঁর দানের হাত আরও বেশি সুপ্রসারিত হতো।’ (বোখারি : ১৮০৩)।