১৯ জুন ২০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটছে। তলিয়ে যাচ্ছে হাজার বাড়িঘর উত্তর ও উত্তর পূর্বঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা। এমনকি সিলেট নগরের কয়েকটি এলাকা। তলিয়ে গেছে আসন্ন সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের কয়েকটি ভোট কেন্দ্রও।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও কানাইঘাট উপজেলঅর সূরমা উত্তর বিস্তর এলাকা ইতোমধ্যে বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। এ সব উপজেলা আশপাশ সিলেট সদর উপজেলার উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি ইউনিয়নে এমনকি সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অতি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। ফলে গোয়াইনঘাট উপজেলার বিস্তর অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত হাজার হাজার মানুষ রয়েছেন পানবন্দী হয়ে পড়েছেন। মঙ্গলবার (১৩ জুন) ভোর থেকে থেকে টানা স্থানীয় ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা যেন ক্রমশ গ্রাস করে ফেলছে সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাট। উপজেলার উনাই হাওরে নির্মানাধীন ব্রিজ, বঙ্গবীর ট্রানিং ও তোয়াকুল ব্রীজ নির্মানে ধীরগতি থাকায় তোয়াকুল, নন্দিরগাঁও রুস্তমপুর,পশ্চিম জাফলং, সদর, পূর্ব জাফলং ও মধ্য জাফলং ইউপির সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়াও গোয়াইনঘাট রাধানগর রাস্তার এক তৃতীয়াংশ বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার কারণে জরুরি কাজে উপজেলা সদরে আসতে কেউ কেউ ইঞ্জিন নৌকা ব্যবহার করছেন।
এছাড়াও উনাই হাওরে বাইপাশ সড়ক নিমজ্জিত থাকায় ঐ এলাকার বাজার গুলোতে নিত্য পণ্যে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে জনসাধারণের দূর্ভোগ চরমে।
একদিকে পানিবন্দী অন্যদিকে মানুষের কর্মসংস্থান না থাকায় দিনমজুর শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছেন ফলে কাটছে মানবেতর দিন। হাওর বেষ্টিত গোয়াইনঘাট উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে গোচারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক পরিবার তাদের গৃহপালিত পশু নিয়ে রয়েছেন শংঙ্কায়। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢল অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বিপদের শংঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় জনসাধারণ।
গোয়াইনঘাটের পাশপাশি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও সিলেট সদর উপজেলা হাটখোলা জালালাবাদ, মোগলগাঁওসহ কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলেছে। এসব এলাকার অনেক রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সব কটি ইউনিয়ন।
সুরমা ও পাহাড়ি নদী লোভার পানিতে কানাইঘাট উপজেলার সুরমার উত্তর সব ক’টি ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। কানাইঘাট পৌরশহরের কয়েকটি এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। পানি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সুরমার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকায় সিলেট নগরের শাজালাল উপশহর, শেখঘাট ও দক্ষিণ সুরমা প্রভৃতি এলাকার অনেক বাসাবাড়ি ও স্কুল মাদ্রাসায় বানের পানি ঢুকে পড়েছে।
ইতোমধ্যে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) কয়েকটি ভোটকেন্দ্রও তলিয়ে গেছে।
সোমবার দুপুরে সিলেট নগরের ভার্তখলা এলাকাস্থ নছিবা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও পাশ্ববর্তী আরেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে তলিয়ে গেছে। বিদ্যালয়গুলো শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে কুমারগাও এলাকার মইয়াচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। এই তিনটি বিদ্যালয়কেই সিটি নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।
সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ১১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ১১১.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, মঙ্গলবার ও বুধবার সিলেটে বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।
সিলেট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারা। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ পয়েন্টে নদীর পানি রেকর্ড করা হয় ১৩.২৬ সেন্টিমিটার। সুরমা নদীর সিলেট সদর পয়েন্টেও পানি বেড়েছে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পানি রেকর্ড হয়েছে ১০.৩৫ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টের বিপৎসীমা হচ্ছে ১০.৮০ সেন্টিমিটার।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, আগামী কয়েক দিনে ১ হাজার ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে সিলেট জেলায়। ফলে সিলেটে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। বন্যা হলে এর ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় আমরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়সল কাদের বলেন, সিলেটে টানা পাঁচ-ছয়দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে কয়েকটি কেন্দ্রের মাঠে পানি উঠেছে। তবে কোনো কেন্দ্রের ভেতরে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া যায়নি। আজও আমাদের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা সবগুলো কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। যেসব কেন্দ্রের মাঠে পানি প্রবেশ করেছে সেখানে বালি ফেলে ভোটারদের দাঁড়ানোর উপযোগী করতে সিটি করপোরেশনকে বলেছি। তারা এ বিষয়ে কাজ করবেন। এছাড়া আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রায় শেষ। মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে আবুল মাল আবদুল মুহিত কমপ্লেক্স থেকে কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হবে। আর সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ আজকেই শেষ হবে।