১৩ জুন ২০২৩


গানের তালে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা

শেয়ার করুন

খলিলুর রহমান : আর মাত্র ৮দিন বাকি। এর পর ২১ জুন সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে ভোট গ্রহণ। ভোট গ্রহণ করা হবে ইভিএম-এ। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আস কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রচারণা ও ক্যাম্পেইন এখন তুঙ্গে। ৪২ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশেনের নির্বাচনে প্রধান পদ হচ্ছে মেয়র। এ  পদে  আইন ও বিধিমত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রাথী। এদের মধ্যে দলীয় মনোনয়নে ৪জন এবং স্বতন্ত্র ৪ জন মেয়র প্রার্থী হয়েছেন।

মেয়র প্রার্থীরা হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী, দলটির যুক্তরাজ্য প্রবাসী নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (নৌকা), জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), জাকের পার্টির মনোনীত প্রার্থী মো. জহিরুল আলম (গোলাপফুল), আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল হানিফ কুটু (ঘোড়া)। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেন- মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন (ক্রিকেট ব্যাট), শাহজাহান মাস্টার (বাস গাড়ি) ও মোশতাক আহমেদ রউফ মোস্তফা (হরিণ)। যদিও ইতিমধ্যে নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা)। তবে তার এ বর্জন মানে প্রত্যাহার নয় ভোটগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রার্থী তালিকায় থাকবেন।

মেয়র পদের নির্বচনটা মূলত দলীয়। যদিও শর্তসাপেক্ষে স্বতন্ত্র পার্থী হওয়ার সুযোগ আছে। আর এ সুযোগে দলের কেউ কেউ দলের সাথে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র সেজে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে যেতেও পারেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশন এর মেয়র পদে দলীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী চারটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একমাত্র সরকার দল আওয়ামী লীগের এক নেতা বিদ্রোহী হয়ে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি হচ্ছেন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আবদুল হানিফ কুটু (ঘোড়া)।

এই নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ছিলেন, টানা দুইবারের নির্বাচিত বর্তমান সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তিনি ঘোষণা দিয়েই নির্বাচন বর্জন করেছেন। এরই মাঝে দক্ষিণ সুরমার যুবদল নেতা মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন (ক্রিকেট ব্যাট) স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হলে দলীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তাকে আজীবন দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।

কাউন্সিলর পদে নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও বিএনপি থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় ৩৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে বিএনপি থেকে আজীবন বহিস্কার করা হয়েছে। কিন্তু সরকার দল আওয়ামী লীগ তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল হানিফ কুটু (ঘোড়া)’র বিরুদ্ধে অদ্যাবধি  সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রতীক পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রার্থীরা নানাভাবে ও নানা পন্থায় প্রচারণা চলালেও প্রতীক বরাদ্ধের পরই প্রতীকে ভোট চেয়ে চালানো শুরু করেছেন নিয়মতান্ত্রিক প্রচারণা। এর আগে সাঁটানো ফেসটুন ব্যানার, বিলবোর্ড ও প্লেকার্ড সব সরিয়ে এখন শুরু করেছেন প্রতীক সম্বলিত সাদাকালো পোস্টার ও লিফলেট নিয়ে বাড়ি বাড়ি ও পাড়া মহল্লায় গণসংযোগ মাইকিং পথসভাসহ রকমফের প্রচারণা। সরব প্রচারণায়  দলীয় মেয়র প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। সরব প্রার্থীরা রাস্তায় রাস্তায় মাইক বাজিয়ে আবার কেউ কেউ নারী-পুরুযষের যুগলকণ্ঠে নির্বাচনী সঙ্গীত ও গান বাজনার তালে মাতিয়ে তুলেছেন নগরবাসীকে । তাদের দেখাদেখি কাউন্সিলর প্রার্থীরাও মাইক ও গান বাজনাকে প্রচারণার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছেন। এতে করে নগরবাসী শব্দদোষণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও করার কিছু নেই।ফলে গান-বাজনার তালে এখন মাতোয়ারা পুরো নগরবাসী

মনোনয়ন ও প্রতীক বরাদ্দের আগে থেকে চলছিল সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণা। পরে মনোনয়ন বঞ্চিতরা ঘরে ফিরে গেলেও মাঠে রয়েছেন দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এদের মধ্যে প্রচারনায় এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ মোনোনীত মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (নৌকা)। তিনি গত ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার দিন থেকেই প্রচারণা শুরু করেন এবং জোরে শোরে চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রচারণায় পথসভার পাশাপাশি মাইকিং, পোস্টার, লিফলেট, অফলাইন, অনলাইন ও সোস্যাল মিডিয়াও ব্যবহার করছেন প্রার্থী এবং তাদের কর্মী সর্মথকরা। অধিকাশং প্রার্থীর প্রচারেই যুক্ত হয়েছে নির্বাচনি গান ও তারানা। গানের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। এতে বিনোদন পাচ্ছেন কর্মী-ভোটার সবাই। সব মিলিয়ে ভোটের গানে জমজমাট হয়ে ওঠেছে সিসিক নির্বাচনের প্রচারণা।

প্রচারনায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দালন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাফেজ মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা)। তবে তার প্রচারে বাদ্যবিহীন সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে। নির্বাচন বর্জন ঘোষনার পর মঙ্গলবার থেকে তার প্রচারকার্য বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রচারণায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল। তবে তার বিরুদ্ধে সোস্যাল মিডিয়ায় নেগেটিভ প্রচারও চলছে সমানতালে । স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকেই প্রথমে  নিরবে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। তবে ক্রমশ তারাও সরব হয়ে ওঠেছেন।

ভোটাররা প্রর্থীদের কাছে কি চান?
সিসিক নির্বাচনে নগর ভোটারদের চাওয়া পাওয়া অনেক। এরমধ্যে নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান। একটি পরিচ্ছন্ন ও চাকচিক্যময় সুন্দর নগরী উপহার প্রত্যেক ভোটারদের চাওয়া পাওয়া। যেখানে সিটি এলাকায় থাকবে না জলাবদ্ধতা ও বন্যা, থাকবেনা যানজট ও জনজট। থাকবেনা গ্যাসবিদ্যুতের সংকট। থাকবেনা পানি সংকট। থাকবেনা নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট। থাকবে সহজলভ্য পণ্যের বাজার, বাজার থাকবে সদা নিয়ন্ত্রিত। যাবাহন ও যানচলাচল থাকবে নিয়ন্ত্রিত। জনচলাচলের সহজ সুব্যবস্থা ও পরিবহণ। থাকবে নাগরিক জীবনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। এসব বিষয়ের অন্তরায় যে সব সমস্যা আছে সেগুলো দুরীকরণই সকল নাগরিকের সমান চাওয়া পাওয়া। শুধু দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন ও এক শ্রেণির মানুষের আনন্দ উপভোগ ও বিনোদনই নাগরিকদের সমষ্টিগত চাওয়া পাওয়া নয়।

নাগরিকদের চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারে মেয়র প্রার্থীরা নির্দিষ্ট করে কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলেও বর্তমান সরকার প্রধানের ঘোষনা ’স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর অংশ হিসেবে ’স্মার্ট সিটি’ উপহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন সরকারদলীয় প্রার্থীসহ সব দলীয় প্রার্থীরা। তবে স্মার্ট সিটির কোনো রূপরেখা বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে পারছেন না তারা।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও একই সুরে প্রতিশ্রুতি দিলেও আলাদাভাবে ‘উন্নত নগরী’ ‘অবাক লাগা উন্নয়ন’ ‘তাক লাগানো উন্নয়ন’ নামে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন। কেউ কেউ আবার গরীবদুঃখী মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও শিক্ষা দীক্ষার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন।

ভোটের পরিবেশ কেমন?
সুষ্ট ভোট অনুষ্ঠনের ব্যাপারে বর্তমান প্রার্থীদের মধ্য থেকে কোনো দ্বিমত বা অভিযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ইভিএম-এ ভোট নিয়ে বিএনপিসহ যেসব দলের সংশয় ছিল তারা ভোটযূদ্ধে অংশ গ্রহণই করেন নি। যারা অংশ গ্রহণ করেছেন তারা সকলেই ইভিএম ভোটকে সুষ্টু মেনে নিয়েই ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তবে নির্বাচনী আচরণ বিধি লংঘন নিয়ে ছোটখাটো কিছু আপত্তি উঠলেও মনোনয়নপূর্ব লংঘন জনিত বিষয়গুলো ধর্তব্য মনে করেনি নির্বাচন কমিশন। সরকারদলীয় প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামানসহ কোনো কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল কালীন আচরণ বিধি লংঘনের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিষ্কৃতি লাভ করেছেন।

উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে ২৭ টি ওয়ার্ড নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন থাকলেও বর্ধিত ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে সিসিক এখন ৪২ ওয়ার্ডে সম্প্রসারিত। যার আয়তন ৭৯ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার এবং এর ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৩ জন। ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৩, নারী ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৮৪ জন এবং হিজড়া ভোটর রয়েছেন ৬ জন।

২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিলেট সিটি কর্পোরেশন ঘোষিত হওয়ার পর সিটির সকল ওয়ার্ডে একযুগে এবারই প্রথম হচ্ছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ অনষ্ঠিত হবে।

শেয়ার করুন