৩ মার্চ ২০১৮


কোয়ারিগুলোতে মৃত্যুর মিছিল, লোভের বলি পাথর শ্রমিকরা

শেয়ার করুন

সৈয়দ বাপ্পী : লোভ যে কতো ভয়ংকর হতে পারে, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সিলেটের পাথর কোয়ারি অধ্যুষিত কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের বাসিন্দারা। প্রতিনিয়ত পাথর কোয়ারির গর্তের পাড় ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা আতঙ্কিত করে তুলছে তাদের। শুধু প্রাণহানি নয়, পাথরখেকোরা লাশ গুমের যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাতে আতঙ্কের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত এক বছরে সিলেটের ৪ উপজেলার পাথর কোয়ারিতে অন্তত শ’খানেক শ্রমিক পাথর চাপা কিংবা গর্তের পাড় ধ্বসা মাটির চাপায় নিহত হয়েছেন। এতো মৃত্যুর পরও ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত থেকে অব্যাহতভাবে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকার কারণ অনুসন্ধানে উঠে আসে ভয়ংকর তথ্য। শুধুমাত্র বেশি পাথর উত্তোলনের ‘লোভ’ দীর্ঘায়িত করছে এ মৃত্যুর মিছিলকে। দরিদ্র শ্রমিকদের লাশের উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়তে কোয়ারির গর্ত মালিকরা দ্বিধাবোধ করছেন না।

জানা গেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শারফিন (শাহ আরেফিন) টিলা, কালাইরাগ, ধলাই নদীর তীর, উৎমা গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি, জাফলং, মন্দিরের জুম, জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর ও কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে শত শত গর্ত করে পাথর উত্তোলন চলছে। একেকটি গর্তে ২০ থেকে ৫০ জনের শ্রমিক টিম আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একেকটি গর্ত ৫০/৬০ গভীর হয়ে থাকে। সমতল ভূমি কিংবা টিলা কেটে শ্রমিকরা গর্তের গভীরে প্রবেশ করে পাথর উত্তোলন করে থাকেন। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, গর্তে উপরের মাটি না সরিয়েই শ্রমিকরা প্রবেশ করায় পাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে থাকে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারির এক লেবার সর্দার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোয়ারির গর্তের মালিকরা আমাদের সাথে ২০ থেকে ৫০ জন শ্রমিকের জন্য চুক্তি করে থাকেন। আমরা সে অনুযায়ী সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জামালগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলা থেকে আমরা শ্রমিক নিয়ে আসি। শ্রমিকদের কোয়ারির পাশে শেড তৈরি করে থাকার জায়গা করে দিই। প্রতিদিন শ্রমিকরা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করে মজুরী পান ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। দৈনিক মজুরীর ক্ষেত্রে পাথর উত্তোলনকারীরা ৫০০ টাকা ও মাথায় করে পাথর স্থানান্তরকারীরা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরী পেয়ে থাকেন।

আবার অনেক শ্রমিক যারা পাঁচ থেকে ৬ জনের একেকটা দল করে ফুট হিসেবে পাথর উত্তোলন করে থাকে। এক্ষেত্রে তারা দৈনিক মজুরী ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত তুলে থাকেন।

জানা গেছে, সমতলভূমি থেকে পাথর উত্তোলনকালে ৩ স্তরে তোলা হয়। প্রথমে পেলুডার মেশিন দিয়ে ১৫/২০ ফুট মাটির স্তর সরানো হয়। আর এ মাটি গর্তের ২/৩ হাত কাছেই স্তুপীকৃত করে রাখা হয়। শ্রমিকরা স্তুপীকৃত মাটির পাশেই গর্ত করে পাথর উত্তোলন শুরু করে।

কাজ পাবেন না এমন শঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে শারপিন টিলার এক লেবার সর্দার মোবাইল ফোনে বলেন, পাথর কোয়ারির গর্তে প্রায়ই ধ্বসে ঘটনা ঘটে। কারণ গর্ত মালিকরা দ্রুত সময়ে বেশি পাথর উত্তোলনে তাগাদা দিয়ে থাকেন। তারা শুধু পাথরই চিনেন। এখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রথম স্তরের মাটি ৫০/৬০ ফুট দুরে স্থানান্তর করছেন না। মাটি দুরে স্থানান্তর করা হলে গর্তের পাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটতো না। অথচ নিজেদের লাভের কথা চিন্তা করে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা ভাবছেন না গর্ত মালিকরা।

কোম্পানীগঞ্জের কালাইরাগ কোয়ারির লেবার সর্দার সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের আবু তাহের বলেন, আমি সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। গর্ত মালিকদের সাথে দেনদরবার করে লেবার সরবরাহ করার চুক্তি করি। প্রতি লেবারের কাছ থেকে দৈনিক ২০ টাকা করে কমিশন পাই। চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন গর্ত মালিককে ২০ থেকে ৫০ জন লেবার সরবরাহ করে থাকি। অনেক সময় শ্রমিকরা বেশি পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করেই উপরে মাটির স্তুপ রেখে গর্তের ভেতর থেকে পাথর তুলতে থাকেন। এ সময় পাড় ধ্বসলে অনেকে হতাহত হন। এক্ষেত্রে শুধু গর্ত মালিকের লোভই নয়, শ্রমিকদের লোভও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

তিনি আরো বলেন, আমার অধীনস্ত কোনো শ্রমিক পাথর কিংবা মাটিচাপায় মারা যায়নি। কারণ আমরা ৩ তলা সিস্টেমে কাজ করি। প্রথম স্তরের কাজ শেষে দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে আমার শ্রমিকরা। আমরা এমনভাবে কাজ করি যাতে পাথর কিংবা মাটি ধ্বস হলেও শ্রমিকরা আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। ধাপে ধাপে গর্তে কাজ করলে শ্রমিকের কোনো ক্ষতি হবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেট চ্যাপ্টারের আহবায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুধুমাত্র লোভের কারণেই সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গর্তের মালিক, লেবার সর্দার, পাথর শ্রমিক, প্রশাসন কেউই ‘লাভ করার লোভ’ ছাড়তে পারছেন না। গর্তের মালিক চান কম সময়ে বেশি পাথর উত্তোলন করা হোক, লেবার সর্দার চান দ্রুত সময়ের মধ্যে পাথর উত্তোলন শেষ হোক, যাতে চুক্তির বাকী টাকা হাতে আসে। শ্রমিকরা চান কম সময়ে বেশি পাথর তুলতে যাতে মজুরী বেশি পড়ে। আর প্রশাসন চায়, তাদের বাটোয়ারা। এই চক্রাকার লোভের ফাঁদই কোয়ারিতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত করছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সিলেটের সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা বলেন, আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণে কোয়ারিগুলোতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন চলছে। সরকারের নীতিমালা, আদালতের নির্দেশনা কোনো কিছুই না মানার কারণে থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। এক্ষেত্রে সকলের সম্মিলিত লোভ ও আইন অমান্য করার প্রবণতাই দায়ী।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল লাইছ বলেন, আদালত ও সরকারের নির্দেশনা মানার জন্য আমরা বার বার ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে থাকি। তারপরও আমাদের ফাঁকি দিয়ে পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে পাথরখেকো চক্র। শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় মূলত গর্তের মালিকদের অতিরিক্ত লোভই দায়ী।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহের রোববার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে গর্ত ধসে ৫ শ্রমিক মৃত্যু হয়। পরে গত বুধবার দুপুরে কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলায় বশির আহমদের গর্তে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে ৩ শ্রমিক মাটি চাপায় মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন আরো দু’জন। এরমধ্যে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি এই শাহ আরেফিন টিলা ধ্বসেই ৫ জন, ১ ও ১১ ফেব্রুয়ারী একই টিলা ধসে ২ জন, ২ ও ৬ মার্চ, ২০ জুলাই এবং ২৬ অক্টোবর আরো ৪ জন সহ সর্বমোট ১৯ জন মারা যান। কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন পাথর কোয়ারীতে শ্রমিক নিহতের ঘটানায় গত বছর ৬ টি, চলতি বছরে ৫ টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু একটি মামলারও অভিযোগ পত্র আদালতে পাঠানো হয়নি।

(আজকের সিলেট/৩ মার্চ/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন