১ মে ২০২৩


সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বসেছে ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার মেশিন’

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : বজ্রপাতের জন্য ‘চিহ্নিত’ দুর্যোগপূর্ণ এলাকা সিলেট। এরই মধ্যে চলতি মাসে একই দিনে সিলেট এর তিন জেলায় ৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এমনটি হচ্ছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। চলতি বর্ষা মৌসুমে আরো বজ্রপাতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার মেশিন) বসানো হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তারা বলছেন, যন্ত্রটি পরীক্ষামূলক বসানো হয়েছে এবং তবে প্রয়োজনের তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা যথেষ্ট নয়-বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

হবিগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ২০২১-২২ অর্থবছরে হবিগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতনিরোধক যন্ত্র স্থাপনের জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলায় ১৫ লাখ, নবীগঞ্জে ৩০, বানিয়াচংয়ে ৪৫, আজমিরীগঞ্জে ৩০, হবিগঞ্জ সদরে ১৫, লাখাইয়ে ২৫, শায়েস্তাগঞ্জে ১০, চুনারুঘাটে ১৫ ও মাধবপুরে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে জেলার ৯ উপজেলায় লাইটিং অ্যারেস্টার মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, হবিগঞ্জে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে ২১ জনের মৃত্যু হয়। এ জেলায় ২০২০ সালে ১৫ ও ২০২১ সালে ১২ জন বজ্রপাতে মারা যান। তিন বছরে মৃত্যু হয়েছে ৪৮ জনের। অর্থাৎ প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এ জেলায়।

হবিগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, জেলার সবকটি উপজেলায় লাইটিং অ্যারেস্টার মেশিন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। গত ৪/৫ মাস আগে আমরা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে হলে চলতি মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে, দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সম্প্রতি বসানো হয়েছে ২৪টি মেশিন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র মতে, গত ১৬ ও ২৩ মার্চ হাওরে বজ্রপাতে মারা গেছেন দুজন। এরপর গত ২৩ এপ্রিল তিন উপজেলায় আরো ৬ জন মারা যান। গেল ২০২২ সালে প্রাণ হারান ১৯ জন। এর আগে ২০২১ এবং ২০২২ সালে ১১ জন করে প্রাণ হারান। ২০২০ সালে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে।

সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ৬টি উপজেলায় ২৪টি বজ্রনিরোধক মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি ছাতক এবং দোয়ারাবাজার উপজেলায় বজ্রপাতে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এ দুটি উপজেলা এ প্রকল্পের বাইরে রয়েছে। তিনশ’ ফুট এলাকার মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম লাইটনিং অ্যারেস্টার নামের এই যন্ত্র। বছরে ওই এলাকায় কতবার বজ্রপাত হলো তারও হিসাব রাখবে যন্ত্রটি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, বজ্রপাত নিরোধক দ- স্থাপন করা গেলে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে লাইটনিং অ্যারেস্টার কাজ করবে। আশপাশে যারা থাকে তারা সুরক্ষা পাবেন। জেলার সবকটা উপজেলায় এখনো বজ্রপাত নিরোধক দ- স্থাপন করা যায়নি। বন্যার কারনে টাকা ফিরে গেছে।

তিনি বলেন, মাত্র চলতি মৌসুমে যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এর কার্যকারিতা দেখতে হলে বর্ষা মৌসুমের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে সিলেট আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, আগে কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। কৃষকের কাছে বড়জোর কাস্তে থাকত। কিন্তু এখন ট্রাক্টরসহ নানা কৃষি যন্ত্রাংশ বা মুঠোফোনের মতো ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে গেছে। এসব ধাতব বস্তুর ব্যবহার বজ্রপাতে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে। গ্রামাঞ্চলে বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করতো বট গাছ বা উঁচু গাছগুলো। এসব গাছের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে বজ্রপাতে শহরের তুলনায় গ্রামে প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। সাধারণতঃ দিনের শেষভাগে বিকেলে এবং রাতের শেষ ভাগে ভোরে বজ্রপাত হয়। বর্তমানে দেখা গেছে, দিনের মধ্য সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে বজ্রপাতেরও ঘটনা ঘটছে, তখন বেশিরভাগ কৃষক মাঠে কাজে থাকেন।

বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আবহাওয়া চরম রূপ নিচ্ছে। বজ্রপাত রোধে লাইটনিং অ্যারেস্টারের সংখ্যা বাড়ানো গেলে এর সুফলও পাওয়া যেতে পারে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই সিলেটে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। চলতি মাসের ২১ এপ্রিল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় বজ্রপাতে তিন শিশু মারা যায়। এর মধ্যে দরবস্ত ইউনিয়নের বিসনাটেক গ্রামের সুলেমান আহমদের ছেলে নাঈম আহমদ (৮) এবং মৃত দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে আঞ্জুমা বেগম (৬) বজ্রপাতে নিহত হয়। একই দিন বিকেলে জৈন্তাপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায় বাংলাবাজার গ্রামের আলম মিয়ার ছেলে ইমন আহমেদ (১০)।

এই প্রাণহানীর একদিন পর ২৩ এপ্রিল রোববার সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে বজ্রপাতে ৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরমধ্যে কৃষক ও কিশোর রয়েছেন। ঈদের পরদিন রোববার সকালে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এসময় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে এই তিন জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা বজ্রপাতের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে ৩ জন, তাহিরপুর উপজেলায় একজন, দোয়ারাবাজারে ২ জন, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল একজন, কমলগঞ্জে একজন এবং সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় একজন মারা যান। আরো দু-একটি প্রাণহানীরও ঘটনা ঘটেছে।

বজ্রনিরোধক দ পরিচিতি
তামা, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি ধাতুর বৈদ্যুতিক রোধের মাত্রা অনেক কম, তাই সাধারণত এ ধরনের ধাতু দিয়ে বজ্রনিরোধক দ- তৈরি করা হয়। এটি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। ৩০-৪০ ফুট লম্বা দণ্ডে তিন-চার ইঞ্চি জিআইপি পাইপ এবং তামার তার থাকে।

লাইটনিং অ্যারেস্টার
লাইটিং অ্যারেস্টার একটি ডিভাইস, যা বসানো থাকবে বজ্রনিরোধক দণ্ডের ওপর। এর মূল কাজ নির্ধারিত ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনা। এতে মিটারের মতো কাউন্টার রয়েছে, কয়টি বজ্রপাত হল তার হিসাব সেখানে থাকবে। সারাক্ষণ সক্রিয় থাকবে এই যন্ত্র।

শেয়ার করুন