১৬ এপ্রিল ২০২৩


জনাজাতের চতুর্থ দিন : যথাযথভাবে যাকাত আদায়ে এগিয়ে আসুন

শেয়ার করুন

শাহিদ হাতিমী : রামজান এলে আমরা দেখতে পাই মুমিন-মুসলমানগণ যাকাত ও ফিতরা আদায়ে গুরুত্ব দেন। আজ ২৪ রামাজান, আজকের সিলেট ডটকমের পাঠকদের সামনে আমরা আলোচনা করবো যাকাত প্রসঙ্গে। কেননা ইসলামের মুল পাঁচ ভিত্তির একটি হচ্ছে যাকাত। রোজা হচ্ছে ৩য়। অর্থাৎ কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাত হচ্ছে ইসলামের মুল ভিত্তি। শুরুতেই আমরা জানবো যাকাতের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য, এবং যাকাত কেন দেবেন? কাকে দেবেন?

ধন-সম্পদের যে নির্ধারিত অংশ শরীয়াতের বিধান মোতাবেক আল্লাহর পথে ব্যয় করা মানুষের উপর ফরজ করা হয়েছে তাকেই যাকাত বলে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২১ খন্ড ৪৭৫ পৃঃ) । প্রত্যেক সামর্থবান মুসলিমের জন্য যাকাত হচ্ছে একান্ত কর্তব্য ও ফরজ । সমাজের ধনী ও সচ্ছল লোকদের বাড়তি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত আদায় করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের মধ্যে যথাযথ বন্টন করাই কর্মসুচির প্রধান বৈশিষ্ট্য ।

এ যাকাতের কথা পবিত্র কুআনে কোন কোন মতে ৩২ বার এবং অধিকাংশের মতে ৮২ বার উল্লেখ রয়েছে। পবিত্র কুরআন বলা হয়েছে-তোমাদের বন্ধুতো একমাত্র আল্লাহ তাঁর রাসুল এবং মুমিন বান্দা যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র (সুরা মায়েদার আয়াত ৫৫)।

যাকাত আদিকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। কারূনের ধ্বংস এসেছিল যাকাত প্রদান না করে কার্পণ্য করার কারণে, ইয়াহুদী বণী ইসরাঈল হতে গৃহিত প্রতিশ্রুতিতে মহান আল্লাহ বলেন- তোমরা সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দিবে (সুরা বাকারা আয়াত ১১০)। পবিত্র কুরআনে এসেছে ঈসা (আঃ) বলেন- তিনি আমাকে আজীবন সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা মারইয়াম আয়াত ১৩)। ইসমাঈল আ. সম্পর্কে বলা হয়েছে- তিনি তার পরিবার পরিজনদের সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন (সুরা মারইয়াম আয়াত ৫৫)।

যাকাতের উদ্দেশ্য : তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহন কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগূলোকে বারাকাতময় করতে পার এর মাধ্যমে (সুরা তাওবাহ আয়াত ১০৩)। যাকাত বাবদ যে আংশটা দেয়া হয় সেটা আল্লাহর নিকট পৌঁছে না। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা লোকে মস্তবড় দাতা বলে প্রশংসা করুক বা পার্থিব কোন প্রয়োজনে দান করলে আল্লাহ পাক কবুল করবেন না। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে আখেরাতে এর উত্তম বদলা পাবেন এবং ইহকালে ও তার ধন সম্পদ কখনো শেষ হবে না। শরী’আতের হুকুমের গোপন রহস্য ও হিকমাত পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সুতরাং শরী’আতের কোন হুকুমের রহস্য ও হিকমাত কারো বুঝে আসুক বা না আসুক তা যে মহান আল্লাহর হুকুম এজন্য বিনা দ্বিধায় অবশ্যই পালন করতে হবে।

যাকাত একটি নৈতিক ব্যবস্থাও, কেননা ধনী লোকদের মানসিকভাবে লোভ, কার্পণ্য আত্মম্ভরিতার ময়লা ও আবর্জনা থেকে পবিত্র করা এবং বদান্যতা, দানশীলতা ও কল্যাণ প্রেমে তাদের পরিশুদ্ধতায় ভরপুর করে দেয় । অন্য লোকদের দুঃখ-দুর্দশায় সহানুভুতি ও দয়া মায়া সহকারে তাদের সাথে একাত্ম করে তোলে। বঞ্চিতদের অন্তরে যে হিংসার আগুন জ্বলে উঠে তা নিভিয়ে দিতে যাকাত বিরাট কাজ করে ও ধনীদের সুখ সম্পদ দেখে তাদের মনে যে কষ্ট অনুভব করে যাকাত তা প্রশমিত করে দেয় ।
যাকাত কোথায় ও কাকে দিতে হবে : এ সম্বন্ধে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ সদাক্বাহ পাবার যোগ্যতা রাখে শুধুমাত্র ফকির, মিসকীন, যাকাত সংগ্রহকারী, যাদের অন্তরে (ইসলামের প্রতি) ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আছে, আর ক্রীতদাস মুক্তিতে, ঋণগ্রস্থরা, আর যারা আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় আছে, আর রাস্তার পথিক । এটা আল্লাহর তরফ থেকে ফরয । আল্লাহ তা’আলা সমস্ত কিছু জ্ঞাত আছেন, আর তিনি হিকমাতওয়ালা (সুরা তাওবাহ আয়াত ৬০) ।

এখানে ৮ ধরনের লোকের কথা বলেছেন- ১) ফকির, ২) মিসকীন, ৩) যাকাত সংগ্রহকাী; তারা হলেন কোন দেশের ইমাম বা তার নায়েব কর্তৃক নিযুক্ত লোক সকল। ৪) যাদের অন্তর ইসলামের দিকে ঝুঁকেছে; যে সমস্ত গরীব বিধর্মী যারা ইসলাম গ্রহণ করতে চায় বা মুসলিমদের শত্রুর হাত হতে রক্ষা করতে চায় তাদের যাকাত দেওয়া যাবে। ৫) ক্রীতদাস মুক্তিতে, দাসদের মুক্ত করা, যারা মুক্তির ব্যাপারে লিখে তাদের সাহায্য করা, শত্রুর হাতে বন্দী তাদেরও মুক্ত করা ইত্যাদি । এ সমস্ত কাজে যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যায়। ৬) ঋণগ্রস্থ : যারা ঋণ করেছে এবং শোধ করার সামর্থ নেই তাদের যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যাবে। ৭) যারা আল্লাহর রাস্তায় আছে : যারা দীন প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছে-যেমনঃ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে, ইত্যাদি ক্ষেত্রে যাকাত দেওয়া যাবে। ৮) রাস্তার পথিক; ঐ মুসাফির যে এক স্থান হতে অন্য স্থানে বা দেশ হতে অন্য দেশে গেছে কিন্তু টাকার অভাবে নিজ গৃহে যেতে পারছে না।

আমাদের যাকাতকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে অনেকের মাঝে না বিলিয়ে আমাদের নিকটতম দরিদ্র আত্মীয় স্বজনকে বা সমাজের ফকির মিসকীনদের এককভাবে দিলে ভালো হবে, যাতে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় প্রতি বছরই তাদের যাকাতের জন্য দ্বারে দ্বারে যেতে হয় এবং তাদের অভাব অন্টনের কোন পরিবর্তন হয় না। যাকাত দেয়া যাবে না যাদেরকে: রাসুল সা. বলেছেন-ধনী বা কর্মক্ষম যারা তাদের এতে কোন অংশ নাই (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, মেশকাত হাদিস ১৭৩৮/১০)। বনু হাশেম গোত্রের হলে যাকাত দেওয়া যাবে না । রাসুল সা. বলেছেন-নিশ্চয়ই যাকাত ও সদাক্বাহ মুহাম্মদ সা. এর বংশধরদের (সায়্যিদ) জন্য নয় (মুসলিম, মিশকাত হাদিস ১৭৩১/৩)। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে যাকাত বন্টনের তৌফিক দিন। আমিন।

(লেখক : জ্যেষ্ঠ সহ সম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম)

শেয়ার করুন